আইফেল টাওয়ারের চেয়েও উঁচুতে দাঁড়িয়ে ভারতীয় ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের এই বিস্ময়! চেনাব ব্রিজের অজানা রহস্য জানলে চমকে যাবেন

জম্মু ও কাশ্মীরের রিয়াসি জেলায় চেনাব নদীর উপর নির্মিত চেনাব রেল ব্রিজ বর্তমানে বিশ্বজুড়ে ভারতীয় ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মুন্সিয়ানার এক অনন্য নিদর্শন হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। নদীর তলদেশ থেকে ৩৫৯ মিটার বা ১,১৭৮ ফুট উঁচুতে অবস্থিত এই ব্রিজটি প্যারিসের বিখ্যাত আইফেল টাওয়ারের চেয়েও প্রায় ৩৫ মিটার উঁচুতে দাঁড়িয়ে রয়েছে। উধমপুর-শ্রীনগর-বারামুলা রেল লিঙ্ক (USBRL) প্রকল্পের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ এই সেতুটি, যা কাশ্মীর উপত্যকাকে দেশের বাকি অংশের সঙ্গে সব আবহাওয়ায় নিরবচ্ছিন্নভাবে যুক্ত করে।

বিশাল আকার ও কাঠামোগত বৈশিষ্ট্য সম্পূর্ণ স্টিল ও কংক্রিট দিয়ে তৈরি এই আর্চ ব্রিজটির মোট দৈর্ঘ্য ১,৩১৫ মিটার বা ৪,৩১৪ ফুট। এর মূল আর্চের দৈর্ঘ্য ৪৬৭ মিটার, যা বিশ্বজুড়ে দীর্ঘতম রেল আর্চগুলোর অন্যতম। পুরো সেতুটিতে মোট ১৭টি স্প্যান রয়েছে এবং মূল আর্চটিকে সাপোর্ট দিচ্ছে ১৩০ মিটার উঁচু দুটি বিশাল পিলার। এই মেগা স্ট্রাকচারটি তৈরিতে প্রায় ২৭,০০০ টন স্টিল এবং ৬৬,০০০ ঘনমিটার কংক্রিট ব্যবহার করা হয়েছে। প্রতিটি স্টিলের কাঠামো নিখুঁতভাবে তৈরি করতে থ্রিডি টেকলা সফটওয়্যার ব্যবহার করা হয়েছে, যাতে ফিটিংয়ের ক্ষেত্রে বিন্দুমাত্র ত্রুটি না থাকে।

নির্মাণের পেছনের অবিশ্বাস্য চ্যালেঞ্জ হিমালয়ের অত্যন্ত দুর্গম পরিবেশে এই ধরনের ব্রিজ নির্মাণ প্রকৌশলীদের কাছে একপ্রকার অসম্ভব চ্যালেঞ্জ ছিল। প্রাথমিক পর্যায়ে যন্ত্রপাতি বা ভারী নির্মাণ সামগ্রী বহন করার মতো কোনো সড়কপথ সেখানে ছিল না। ফলে দুর্গম পাহাড়ি পথে ঘোড়া ও মানুষের পিঠে করে সামগ্রী বয়ে নিয়ে যেতে হয়েছিল। পরবর্তীতে আর্চ নির্মাণের কাজের জন্য বিশ্বের সর্বোচ্চ ক্রসব্যার কেবল ক্রেন ব্যবহার করা হয়। ক্যান্টিলিভার পদ্ধতিতে আর্চের দুই দিক থেকে নির্মাণ কাজ শুরু হয়ে ২০২১ সালের এপ্রিলে তা সফলভাবে মাঝখানে এসে যুক্ত হয়।

প্রাকৃতিক বিপর্যয় মোকাবেলায় বিশেষ সুরক্ষা জম্মু ও কাশ্মীরের ভৌগোলিক জটিলতা এবং সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এই সেতুটির ডিজাইন করা হয়েছে। ইঞ্জিনিয়ারদের নিখুঁত পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই ব্রিজটি ঘণ্টায় ২৬৬ কিলোমিটার বেগের প্রচণ্ড ঝড় এবং রিখটার স্কেলে ৮ মাত্রার তীব্র ভূমিকম্প সহ্য করতে সক্ষম। এমনকি মাইনাস ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রাতেও এর কার্যকারিতা অটুট থাকে। পাশাপাশি, যেকোনো ধরনের নাশকতা রোধ করতে ব্রিজটিকে বিস্ফোরণরোধী করেও ডিজাইন করা হয়েছে।

যোগাযোগ ব্যবস্থায় ঐতিহাসিক বিপ্লব প্রায় ২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা এই বিশাল প্রকল্পের কাজ শেষে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এটি উদ্বোধন করেন। বিশ্বের সর্বোচ্চ রেলওয়ে সেতু হিসেবে এটি ইতিমধ্যেই গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে স্থান করে নিয়েছে। এই ব্রিজের উপর দিয়ে বন্দে ভারত এক্সপ্রেসের মতো আধুনিক ট্রেন চলাচল করায় কাটরা থেকে শ্রীনগর যাতায়াতের সময় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। দুর্গম পাহাড়ি উপত্যকাকে মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে জুড়ে দিয়ে দেশের পরিকাঠামো উন্নয়নে এক নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে এই চেনাব ব্রিজ।