আইনি লড়ে বদলে দিলেন সেনার ইতিহাস! ৩১ বছরের গৌরবময় কেরিয়ার শেষে অবসর নিলেন কর্নেল সীমা সিং

ভারতীয় সেনাবাহিনীর ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটিয়ে ৩১ বছরের গৌরবময় সামরিক সেবা সম্পন্ন করে গত ১ অক্টোবর, ২০২৬ তারিখে অবসর গ্রহণ করেছেন কর্নেল সীমা সিং। প্রয়াগরাজের কৃতি সন্তান সীমা সিং-এর এই বর্ণাঢ্য সামরিক জীবন কেবল ইউনিফর্মের অনুশাসন বা স্রেফ নেতৃত্বের গণ্ডির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং ভারতীয় আর্মিতে নারী অফিসারদের জন্য সমানাধিকার, স্থায়ী কমিশন এবং পুরুষদের সমকক্ষ সুযোগ আদায়ের এক দীর্ঘ ও রক্তক্ষয়ী আইনি লড়াইয়ের প্রতীক হয়ে রয়েছে তাঁর নাম।
২০০৬ সালের ডিসেম্বর মাসে শুরু হওয়া এই আইনি সংগ্রাম সম্পর্কে কর্নেল সীমা সিং স্পষ্ট জানিয়েছিলেন যে তাঁর এই লড়াই কোনোমতেই সেনাবাহিনী বা পুরুষ অফিসারদের বিরুদ্ধে ছিল না। তাঁর মূল লক্ষ্য ছিল সেই সমস্ত পুরোনো নীতি ও রক্ষণশীল ব্যবস্থাকে আমূল পরিবর্তন করা, যা নারী অফিসারদের পুরুষদের মতো সমান কেরিয়ার গড়ার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াত। তিনি সর্বদা এই বিশ্বাসে অটল ছিলেন যে যোগ্যতা এবং মেধা কখনই লিঙ্গভেদের ওপর নির্ভর করে না। তাই নারী কর্মকর্তাদের তাদের দক্ষতা ও প্রতিভার ভিত্তিতেই সুযোগ দেওয়া উচিত।
তাঁর এই দীর্ঘ লড়াইয়ের প্রথম বড় সাফল্য আসে ২০১১ সালে, যখন সুপ্রিম কোর্ট ১১ জন মহিলা শর্ট সার্ভিস কমিশন অফিসারকে পুনর্বহাল করার ঐতিহাসিক নির্দেশ দেয়। সে সময় মেজর পদে কর্মরত সীমা সিংও ছিলেন সেই লড়াকু অফিসারদের দলে। এরপর ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে সুপ্রিম কোর্টের এক যুগান্তকারী রায় এই সংগ্রামের চূড়ান্ত রূপ দেয়। আদালতের সেই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তই নারী অফিসারদের জন্য স্থায়ী কমিশন লাভের পথ উন্মুক্ত করে এবং তাঁদের কম্যান্ড পোস্ট বা ইউনিটের নেতৃত্ব দেওয়ার যোগ্য করে তোলে।
আইনি লড়াইয়ের গণ্ডি পেরিয়ে ময়দানেও নিজের দক্ষতার অনন্য স্বাক্ষর রেখেছেন কর্নেল সীমা সিং। তিনি সেনাবাহিনীর একটি অর্ডন্যান্স ইউনিটের অত্যন্ত সফল কমান্ডিং অফিসারের দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০২৫-২৬ সালের মধ্যে তাঁর নেতৃত্বাধীন ইউনিট দুটি অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ সম্মান অর্জন করে—জিওসি-ইন-সি ইউনিট সাইটেশন এবং ডিজিওএস ইউনিট অ্যাপ্ৰিসিয়েশন। ইউনিটের অসাধারণ কর্মক্ষমতা এবং ‘অপারেশন সিন্দুড়’-এর সময় পাঠানকোটে তাঁর সাহসী ও অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ এই সম্মান দেওয়া হয়।
৩১ বছরের এই সুদীর্ঘ কেরিয়ার এমন এক সময়ের সাক্ষী, যখন সামরিক বাহিনীতে নারীদের সুযোগ অত্যন্ত সীমিত ছিল। মেজর থেকে স্থায়ী কমিশন অর্জন, কর্নেল পদে পদোন্নতি এবং একটি ইউনিটের সফল নেতৃত্ব দেওয়া—তাঁর প্রতিটি পদক্ষেপে রয়েছে সাহসিকতার গল্প। ১ অক্টোবর সামরিক জীবন থেকে তিনি অবসর নিলেও, ভারতীয় আর্মিতে নারী শক্তির পথপ্রদর্শক হিসেবে কর্নেল সীমা সিং-এর নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।