অভিষেকের বাড়ির অন্দরমহলে পুলিশ, সুমিত রায়ের রহস্যময় লোকেশনে তোলপাড় রাজনীতি

ভোররাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে কালীঘাটে এক অভূতপূর্ব রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক উত্তেজনার সৃষ্টি হলো। তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কালীঘাটের বাসভবনে হানা দিল শালবনি থানার পুলিশের একটি বিশেষ দল। সঙ্গে ছিল বিপুল সংখ্যক কেন্দ্রীয় বাহিনী। প্রায় ৫ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে চলা এই তল্লাশি অভিযানের জেরে রাজ্যের রাজনৈতিক মহলে শুরু হয়েছে তীব্র জল্পনা। পুলিশের দাবি, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যক্তিগত আপ্তসহায়ক সুমিত রায়ের সন্ধানেই এই অভিযান, যার বিরুদ্ধে রয়েছে গুরুতর আর্থিক জালিয়াতির অভিযোগ।
ঘটনার সূত্রপাত শুক্রবার গভীর রাতে। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, জমি দুর্নীতি মামলায় ধৃত মেদিনীপুরের প্রাক্তন বিধায়ক সুজয় হাজরাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে সুমিত রায়ের নাম উঠে আসে। এরপরই তদন্তকারী দল সুমিত রায়ের মোবাইল ফোনের টাওয়ার লোকেশন ট্র্যাক করা শুরু করে। সেই লোকেশনের শেষ সিগন্যাল পাওয়া যায় খোদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কালীঘাটের বাসভবনে। এই তথ্যের ভিত্তিতে শালবনি থেকে রাতেই একটি পুলিশি দল কলকাতায় পৌঁছায়। অভিযোগ, বারবার ডাকার পরেও বাড়ির ভিতর থেকে কোনো সাড়া না মেলায় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের অংশ হিসেবে পুলিশ বাড়ির মূল গেটের তালা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে।
অভিষেকের বাড়ির চারপাশ ঘিরে ফেলে কেন্দ্রীয় বাহিনী। নিরাপত্তার খাতিরে এলাকাটি পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়। খবর পেয়েই ভোরে সেখানে ছুটে যান রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সকাল ৮টা পর্যন্ত তিনি সেখানে ছিলেন, যদিও অভিযানের বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করেননি তিনি। তবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপস্থিতি পরিস্থিতির গাম্ভীর্যকে আরও বাড়িয়ে দেয়।
তল্লাশি পর্ব শেষে বাড়ির বাইরে এসে সরাসরি সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি ক্ষোভের সুরে জানান, পুলিশের এই কার্যকলাপ কোনো সাধারণ তল্লাশি নয়, বরং পরিকল্পিত হেনস্থা। তিনি বলেন, “গোটা বাড়ি তন্ন তন্ন করে তল্লাশি চালানো হয়েছে, কিন্তু কিছুই পাওয়া যায়নি। আমার বাড়ির তালা ভেঙে ঢোকার এই ছবি এবং পুলিশের অসংলগ্ন আচরণ সিসিটিভি ক্যামেরায় রেকর্ড করা হয়েছে।” তদন্তে সহযোগিতা করার কথা জানালেও, তিনি পুলিশের এই অতি-সক্রিয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
সাম্প্রতিককালে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক পরিস্থিতির অস্থিরতা নতুন কিছু নয়। বিধানসভা নির্বাচনে হারের পর থেকেই তাঁকে বিভিন্ন আইনি জটিলতা ও সমালোচনার মুখে পড়তে হচ্ছে। সোনারপুরে দলীয় কর্মীর পরিবারকে সমবেদনা জানাতে গিয়ে ডিম-হামলার ঘটনা হোক বা সই-জালিয়াতি কাণ্ডে নাম জড়ানো— একের পর এক ঘটনা তাঁর রাজনৈতিক জীবনকে কঠিন পরীক্ষার মুখে ফেলেছে। এখন এই পুলিশি তল্লাশি সেই জটিলতাকে আরও কতখানি ত্বরান্বিত করে, তা নিয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা প্রহর গুনছেন। সুমিত রায়ের মতো ঘনিষ্ট সহযোগীকে ঘিরে এই নজিরবিহীন পদক্ষেপ তৃণমূলের অন্দরে কত বড় ভাঙন ধরাবে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।