অভাবের তাড়নায় স্কুল থেকে বিতাড়িত! আজ নিজের হাতে গড়া স্কুলে শত শত শিশুর ভবিষ্যৎ গড়ছেন উদ্দেশ্য সচন

অভাবের কারণে একসময় স্কুল থেকে বের করে দেওয়া হয়েছিল তাঁকে। পরিবারের পক্ষে পড়ার ফি জোগানো সম্ভব না হওয়ায় মাঝপথেই থমকে গিয়েছিল শৈশব। কিন্তু সেই অপমান, বঞ্চনা বা কষ্ট তাঁকে থামিয়ে দিতে পারেনি। বরং জীবনের সেই কঠিন অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি এমন এক অভিনব স্কুল গড়ে তুলেছেন, যেখানে প্রথাগত পড়াশোনার পাশাপাশি শিশুদের শেখানো হয় জীবনে প্রকৃত অর্থে সুখী হওয়ার মূল্যবান পাঠ। এই ব্যতিক্রমী ও অনুপ্রেরণামূলক মানুষটি হলেন কানপুরের বাসিন্দা উদ্দেশ্য সচন, যাঁর জীবনকাহিনি আজ বহু মানুষকে নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শেখায়।
কানপুরের এক সাধারণ পরিবারে কেটেছে উদ্দেশ্যের ছোটবেলা। তাঁর বাবা পেশায় ছিলেন একজন সাধারণ দর্জি এবং মা গৃহবধূ। নুন আনতে পান্তা ফুরোনোর সংসারে অর্থাভাব ছিল নিত্যসঙ্গী। একটা সময় পরিস্থিতি এমন চরম আকার ধারণ করে যে, স্কুলের বকেয়া ফি দেওয়া পরিবারের পক্ষে আর কোনোভাবেই সম্ভব হয়নি। বাধ্য হয়ে তাঁকে স্কুল ছাড়তে হয়। অত্যন্ত কোমল বয়সে পাওয়া সেই অপমানের অভিজ্ঞতা তাঁর মনে গভীর দাগ কেটেছিল। তবে ভাগ্যের কাছে হার না মেনে সেই কষ্টকেই নিজের শক্তির জ্বালানি বানিয়েছিলেন উদ্দেশ্য। নিজের জীবন কঠিন লড়াইয়ের মাধ্যমে গড়ার পাশাপাশি তাঁর মনে এক সুদূরপ্রসারী স্বপ্ন জন্ম নেয়—অর্থের অভাবে যেন আর কোনো শিশুকে কোনোদিন স্কুল থেকে বঞ্চিত হতে না হয়। আর সেই মহৎ ভাবনা থেকেই শুরু হয় তাঁর জীবনের নতুন অধ্যায়।
শুরুটা একেবারেই সহজ ছিল না। কোনো বড় পরিকাঠামো বা পাকা ভবন ছাড়াই তিনি গাছতলায় মাত্র পাঁচজন শিশুকে নিয়ে শিক্ষাদানের কাজ শুরু করেছিলেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর নিষ্ঠা দেখে এলাকার মানুষের ভরসা বাড়তে থাকে এবং ধীরে ধীরে পড়ুয়ার সংখ্যাও বৃদ্ধি পায়। ছোট্ট সেই উদ্যোগই সময়ের সঙ্গে এক পূর্ণাঙ্গ ও সুশৃঙ্খল স্কুলে রূপ নেয়। আজ সেই প্রতিষ্ঠানে শত শত শিশু বিনামূল্যে বা নামমাত্র খরচে নিয়মিত পড়াশোনা করার সুযোগ পাচ্ছে।
উদ্দেশ্যের স্কুলের মূল লক্ষ্য শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল করা কিংবা বড় চাকরি পাওয়ার ইঁদুর দৌড়ে সামিল হওয়া নয়। তাঁর গভীর বিশ্বাস, শিক্ষার আসল অর্থ কেবল কিতাবি সাফল্য অর্জন করা নয়, বরং একজন ভালো মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকা এবং মানসিকভাবে সুখী হওয়াও সমানভাবে জরুরি। তাই তাঁর পরিচালিত এই স্কুলে পাঠ্যপুচকের শিক্ষার পাশাপাশি আনন্দ, মানবিকতা, পরোপকার এবং জীবনের নানা নৈতিক মূল্যবোধের পাঠ দেওয়া হয়।
উদ্দেশ্যের নিজের জীবনের প্রতিটি সংগ্রামের মুহূর্ত যেন এই শিক্ষার সবচেয়ে বড় এবং জীবন্ত উদাহরণ। যে শিশু একদিন অর্থাভাবে স্কুলের দরজা থেকে ফিরে আসতে বাধ্য হয়েছিল, সময়ের হাত ধরে সেই মানুষটিই আজ এমন একটি নিরাপদ আশ্রয় তৈরি করেছেন, যেখানে কোনো শিশুই অর্থের অভাবে শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত হয় না। একসময় যে স্কুলগুলির দরজা তাঁর নিজের জন্য চিরতরে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, আজ নিজের হাতে গড়া সেই স্কুলের দরজা তিনি খুলে দিয়েছেন সমাজের পিছিয়ে থাকা অসংখ্য শিশুর জন্য। উদ্দেশ্যের এই লড়াই কেবল দারিদ্র্যকে জয় করার সাধারণ কোনো গল্প নয়, বরং নিজের জীবনের চরম কষ্টকে অন্যের জীবনে আশার আলোয় বদলে দেওয়ার এক অনন্য ও অমর উপাখ্যান।