একজন চিকিৎসকের কাজ কী? মানুষকে সুস্থ করে তোলা। আর লড়াই শেষ হলে পরম বেদনায় তাঁর মৃত্যুর শংসাপত্র বা ‘ডেথ সার্টিফিকেট’ লেখা। বীরভূমের লাভপুরের সুকুমার চন্দ্র ওরফে সবার প্রিয় ‘বিশু ডাক্তার’ গত কয়েক দশকে এমন শংসাপত্র লিখেছেন বহু। কিন্তু ৯৮ বছর বয়সে এসে গত সপ্তাহে যা ঘটল, তার জন্য বোধহয় আজীবন মানুষের সেবা করা এই মানুষটি প্রস্তুত ছিলেন না। জীবনের দীর্ঘ পথ চলার সঙ্গী, ৮৯ বছর বয়সী স্ত্রী রাধাদেবীর মৃত্যুর শংসাপত্র লিখতে গিয়ে প্রথমবারের মতো কেঁপে উঠল তাঁর কলম।
তারাশঙ্করের সেই নির্দেশ ও ত্যাগের জীবন: আরজি কর মেডিক্যাল কলেজ থেকে পাশ করার পর উত্তরপ্রদেশের অর্ডন্যান্স ফ্যাক্টরির হাসপাতালে আকাশছোঁয়া বেতনের চাকরির সুযোগ পেয়েছিলেন বিশু বাবু। কিন্তু তাঁর বাল্যবন্ধু শরৎচন্দ্রের বাবা, প্রখ্যাত কথা সাহিত্যিক তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁকে আটকে দেন। তারাশঙ্কর বলেছিলেন, “তুমি চলে গেলে গ্রামবাসীরা বিনা চিকিৎসায় মরবে, গ্রামে থেকেই মানুষের সেবা করো।” সেই নির্দেশ শিরোধার্য করে মাত্র ১ টাকা ভিজিটে শুরু হয়েছিল তাঁর গ্রাম-সেবা। আজও তাঁর কোনো নির্দিষ্ট ভিজিট নেই; যে যা দেয় তাতেই তুষ্ট তিনি।
কর্তব্য যখন শোকের চেয়ে বড়: ২০২০ সালে রাজ্য সরকারের জীবনকৃতি সম্মান পাওয়া এই মানুষটির জীবনের পরতে পরতে শোকের ছায়া। দু’বছর আগে নিজের চিকিৎসক ছেলে সৌমিত্র চন্দ্র ফুসফুসের সংক্রমণে মারা যান। শোকের সেই পাহাড় বয়েও ছেলের শ্রাদ্ধের দিন রোগী দেখেছিলেন তিনি। তাঁর যুক্তি ছিল— “মানুষের কষ্ট তো শোকের অপেক্ষায় বসে থাকে না।”
শেষ বিদায়ে কাঁপল হাত: নাট্যকর্মী উজ্জ্বল মুখোপাধ্যায় জানান, গত সপ্তাহে স্ত্রী রাধার মৃত্যুর দিন বড়ই বিচলিত হয়ে পড়েছিলেন বিশু ডাক্তার। যে হাত হাজারো জটিল অস্ত্রোপচার বা প্রেসক্রিপশনে কখনও কাঁপেনি, সেই হাত স্ত্রীর ডেথ সার্টিফিকেট লিখতে গিয়ে বারবার থমকে যাচ্ছিল। নিজের ধরা গলায় বিশু বাবু শুধু বললেন, “এই দিনটাও আমাকে দেখতে হবে সেটা কোনও দিন ভাবিনি।”
সম্পাদকের নোট: বর্তমান কর্পোরেট যুগে যখন চিকিৎসা পরিষেবা এক বিশাল ব্যবসা, তখন ৯৮ বছর বয়সী বিশু ডাক্তারের এই ত্যাগ ও আদর্শ আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় প্রকৃত ‘মানবসেবা’ কাকে বলে। তাঁর এই ব্যক্তিগত শোকের দিনে আমরা তাঁর অটল আদর্শকে কুর্নিশ জানাই।