শান্তিনিকেতনের ঐতিহ্যবাহী পৌষমেলা, ব্রহ্মধর্মে দীক্ষা থেকে সব ধর্মের মিলনক্ষেত্র হয়ে ওঠার ইতিহাস

শান্তিনিকেতনের ঐতিহ্যবাহী পৌষমেলা শুরু হয়েছিল মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের ব্রহ্মধর্মে দীক্ষিত হওয়ার দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখতে।

ব্রহ্মধর্মে দীক্ষা ও পৌষ উৎসবের সূচনা:

  • দীক্ষা: সময়টা ছিল ১৮৪৩ সালের ২১ ডিসেম্বর (বাংলার ৭ পৌষ)। এই দিন মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর রামচন্দ্র বিদ্যাবাগীশের কাছে ব্রহ্মধর্মে দীক্ষিত হন। এরপর ব্রহ্মধর্মের প্রসার বৃদ্ধি পায়।

  • প্রথম উপাসনা: দীক্ষিত হওয়ার দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখতে এবং ব্রহ্মধর্মের প্রসারের স্বার্থে মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৮৪৫ সালে কলকাতার গোরিটির বাগানে উপাসনা ও ব্রহ্ম মন্ত্রপাঠের ব্যবস্থা করেন। এই বিষয়টিকে বোলপুর শান্তিনিকেতনের ঐতিহ্যবাহী পৌষমেলার সূচনা বলে ধরা হয়।

  • আশ্রম প্রতিষ্ঠা: ১৮৬২ সালে মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর শান্তিনিকেতনে আশ্রম প্রতিষ্ঠার চিন্তা ভাবনা শুরু করেন এবং সেই চিন্তাধারা থেকেই আশ্রম প্রতিষ্ঠিত হয়।

শান্তিনিকেতনে পৌষ উৎসব ও মেলার শুরু:

  • পৌষ উৎসবের সূচনা: ১৮৯১ সালের ৭ পৌষ ব্রহ্মমন্দির (যা বর্তমানে উপাসনা গৃহ নামে পরিচিত) প্রতিষ্ঠা করা হয়। এটিকেই শান্তিনিকেতনে পৌষ উৎসবের সূচনার সময় হিসাবে ধরা হয়।

  • পৌষমেলার শুরু: ১৮৯৪ সালে পৌষ উৎসবের পাশাপাশি মন্দির সংলগ্ন মাঠে ঐতিহ্যবাহী পৌষমেলা শুরু হয়।

মহর্ষির ট্রাস্ট ডিড এবং মেলার উদ্দেশ্য:

১৮৮৮ সালের ৮ মার্চ মহর্ষি ট্রাস্ট-এর ডিড-এ দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর পৌষমেলা সম্পর্কে স্পষ্ট উল্লেখ করে গিয়েছিলেন যে শান্তিনিকেতন ট্রাস্ট প্রতি বছর একটি মেলার আয়োজন করবে। তাঁর উল্লেখ অনুযায়ী, এই মেলার উদ্দেশ্য ও বৈশিষ্ট্য ছিল:

  • মিলন ক্ষেত্র: মেলাটি হবে মূলত সব ধর্মের মানুষের এক মহৎ মিলন ক্ষেত্র

  • ধর্মীয় বৈশিষ্ট্য: মেলায় কোনো প্রকার মূর্তি পুজো হবে না।

  • বেচা-কেনা: মদ ও মাংস ব্যতীত এই মেলায় সবরকম খাবার বেচা-কেনা হবে। এর পাশাপাশি নিত্যদিনের প্রয়োজনীয় সামগ্রী বিক্রি করা হবে।

  • আয়ের ব্যবহার: মেলা থেকে কোনো প্রকার আয় হলে সেই টাকা আশ্রমের উন্নতিকল্পে ব্যয় করা হবে।

পরবর্তী পরিবর্তনসমূহ:

  • মেলা বন্ধ: ১৯৪৩ সালে দেশে দুর্ভিক্ষ ও মহামারীর কারণে প্রথমবার পৌষমেলা বন্ধ রাখা হয়।

  • সমাবর্তন: ১৯৪৪ সাল থেকে মেলার সময় সমাবর্তন অনুষ্ঠান শুরু হয়।

  • উপাসনার স্থান বদল: ১৯৫০ সালে মেলার পরিসর বৃদ্ধি হওয়ার কারণে ব্রহ্মমন্দিরের পরিবর্তে ছাতিমতলায় উপাসনা শুরু হয়।

  • স্থানান্তর: এরপর ১৯৬১ সালে এই পৌষমেলার স্থান পরিবর্তন হয়। মন্দির সংলগ্ন মাঠ থেকে মেলা পূর্বপল্লির মাঠে নিয়ে যাওয়া হয়। সেই থেকে আজও নিয়ম মেনে পৌষ মেলার আয়োজন করা হয়। (যদিও করোনা মহামারীর সময় মেলা বন্ধ ছিল)।

Related Posts

© 2026 Tips24 - WordPress Theme by WPEnjoy