গৌরবময় ৯৪ বছর! ব্রিটিশদের চোখরাঙানি উপেক্ষা করে কেন আজও ভারতীয় বাজারের রাজা ‘বোরোলিন’?

বঙ্গে শীতের আগমন মানেই ত্বকের শুষ্কতা, ঠোঁট ফাটা, আর গোড়ালি ফাটার সমস্যা। আর এই সমস্যাগুলির সহজ সমাধান খুঁজতে গিয়ে প্রতিটি ভারতীয় বাড়িতে যে জিনিসটির ছবি ভেসে ওঠে, তা হলো সবুজ টিউব বা সাদা-সবুজ কৌটোর ‘বোরোলিন’। ৯৪ বছর ধরে এই ‘সুরভিত অ্যান্টিসেপটিক ক্রিম’ বিদেশি ব্র্যান্ডের ভিড়ে নিজের স্থান শুধু ধরে রাখেনি, এটিকে এখন ‘মেড ইন বেঙ্গল’-এর ঐতিহ্য হিসাবে গণ্য করা হয়। বাঙালি যে ব্যবসা করতে জানে না, যারা এই কথা বলেন, বোরোলিনের সাফল্যের এই কাহিনি তাদের কাছে একটি জ্বলন্ত জবাব।

জন্ম কলকাতায়, ব্রিটিশ শাসনকালে:

বোরোলিনের উৎপত্তির ইতিহাস শুরু হয় ১৯২৯ সালে, ব্রিটিশ-শাসিত ভারতে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়, কলকাতার বাসিন্দা গৌর মোহন দত্ত ভারতীয় পণ্যকে উৎসাহিত করার লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠা করেন জিডি ফার্মাসিউটিক্যালস। তাঁর লক্ষ্য ছিল ভারতীয়দের জন্য একটি সাশ্রয়ী মূল্যের, উচ্চ মানের ক্রিম তৈরি করা। তিনি পশ্চিমবঙ্গের চকবাগিতে ২০ একর জমিতে প্রথম কারখানা তৈরি করেন। এই ক্রিমটি শুধু ত্বকের যত্নের জন্যই নয়, পোড়া, কাটা এবং অ্যান্টিসেপটিক ক্রিম হিসাবেও দ্রুত জনপ্রিয়তা লাভ করে।

জনপ্রিয়তার শীর্ষে বোরোলিন:

বিশ্বাস এবং উপাদান: সাধারণত কোম্পানিগুলি তাদের পণ্যের উপাদান প্রকাশ করে না, কিন্তু বোরোলিন প্রকাশ্যে এর মূল উপাদানগুলি জানায়। এই ক্রিমে রয়েছে অ্যান্টিসেপটিক বোরিক অ্যাসিড, জিঙ্ক অক্সাইড এবং অ্যানহাইড্রাস ল্যানোলিন, যা মানুষের মধ্যে আস্থা বাড়িয়ে তোলে।

হাতির লোগো: সবুজ টিউবে হাতির লোগো থাকার কারণে এটি “হাতির ক্রিম” নামেও পরিচিতি লাভ করে।

স্বাধীনতার উদযাপন: ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট ভারত স্বাধীনতা লাভ করলে, জিডি ফার্মাসিউটিক্যালস সংবাদপত্রে বিজ্ঞাপন প্রকাশ করে এবং এই ঐতিহাসিক মুহূর্তটি উদযাপনে বিনামূল্যে ১ লক্ষ বোরোলিনের টিউব বিতরণ করে! এই ঘটনা বোরোলিনকে একটি দেশপ্রেমিক ব্র্যান্ড হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করে।

পরবর্তীকালে, গৌরমোহনের ছেলে দেবাশিষ দত্ত কোম্পানির এমডি হওয়ার পর এর প্রবৃদ্ধি আকাশছোঁয়া হয়। স্বয়ং পণ্ডিত জওহরলাল নেহেরু থেকে শুরু করে সুপারস্টার অভিনেতারাও এই ক্রিম ব্যবহার করতেন। আজ বোরোলিন শুধু ভারতেই নয়, ওমান, তুরস্ক, বাংলাদেশ এবং সংযুক্ত আরব আমিরশাহির মতো আন্তর্জাতিক বাজারেও ব্যবসা করছে।

জি. ডি. ফার্মাসিউটিক্যালস একটি বেসরকারি সংস্থা হলেও, ২০২৫ সালের মার্চ পর্যন্ত তাদের মোট আয়ের পরিমাণ ছিল প্রায় ₹৩৫,৬০,৯৯,৬১০০ টাকা। ২০১৭ সাল পর্যন্ত অ্যান্টিসেপটিক স্কিনকেয়ার বাজারে বোরোলিনের বাজার অংশ ছিল প্রায় ২৫%। এত বছর ধরে এটি প্রমাণ করেছে, বোরোলিন শুধু একটি ক্রিম নয়—এটি বাঙালি উদ্যোগ এবং ব্যবসায়িক মেধার প্রতীক।

Related Posts

© 2026 Tips24 - WordPress Theme by WPEnjoy