মন খারাপ হলেই কেন কষ্টের গান শুনি আমরা? জেনে নিন এর পেছনের বিজ্ঞান!

জীবনে সুখ-দুঃখের আনাগোনা লেগেই থাকে। যেমন হাসিমুখ আনন্দের বহিঃপ্রকাশ, তেমনই মন খারাপের সময় রাগ বা বিষণ্ণতাও স্বাভাবিক। দুঃখের মুহূর্তে অনেকেই নিজেদের গুটিয়ে নেন, একা থাকতে ভালোবাসেন। আর এই সময়টাতে বেশিরভাগ মানুষই আশ্রয় খোঁজেন কষ্টের গানের সুরে। কিন্তু কেন এমন হয়? মন খারাপ হলেই আমরা কেন দুঃখের গান শুনতে চাই?
মানুষ বিভিন্ন কারণে দুঃখের গান শুনতে পারেন। তবে মন খারাপের সময়ে বিষণ্ণ সুর বা কষ্টের গান যেন আমাদের আরও বেশি টানে। গবেষকদের মতে, এই ধরনের গান আমাদের নেতিবাচক আবেগ প্রকাশ করতে সাহায্য করে। আর এর মাধ্যমেই ধীরে ধীরে আমরা আরও বাস্তববাদী হয়ে উঠি।
কিন্তু প্রশ্ন হল, মন ভালো করতে দুঃখের গানই কেন এত সাহায্য করে? আসলে, যখন কোনো দুঃখের গানের কথা আমাদের নিজেদের অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিলে যায়, তখন সেই গানটি শুনে আমরা যেন একাকীত্ব অনুভব করি না। মনে হয়, এমন কষ্টের অভিজ্ঞতা আরও অনেকেরই হয়েছে। এই ভাবনা থেকেই হয়তো মনে এক ধরনের ইতিবাচক অনুভূতি জন্ম নেয়।
বিজ্ঞান কী বলছে?
একাধিক গবেষণা বলছে, দুঃখের গান শোনার মাধ্যমে মানসিক শান্তি লাভ করা যায়। মিউজিক থেরাপি মানসিক প্রশান্তি বাড়াতে এবং মন-মেজাজ নিয়ন্ত্রণে আনতে বিশেষভাবে সাহায্য করে। আসুন, জেনে নেওয়া যাক কষ্টের গান শোনার আরও কিছু উপকারিতা:
প্রোলেকটিন হরমোন বৃদ্ধি করে: দুঃখের গান উপভোগ করার অন্যতম কারণ হল প্রোলেকটিন হরমোন। যদিও এই হরমোন মূলত স্তন্যদানের সঙ্গে জড়িত, তবে এর কিছু মানসিক প্রভাবও রয়েছে। নারী ও পুরুষ উভয়ের শরীরেই এই হরমোন নিঃসৃত হয়। দুঃখ বা অন্য কোনো মানসিক চাপের মোকাবিলায় প্রোলেকটিনের বেদনানাশক প্রভাব আমাদের কষ্ট কমাতে সাহায্য করে। যখন আমরা শোকের মধ্যে থাকি, তখন প্রোলেকটিন আমাদের শান্ত ও সান্ত্বনার অনুভূতি দেয়। দুঃখের গান শোনার ফলে প্রোলেকটিন হরমোনের নিঃসরণ বাড়ে, যা মানসিক কষ্ট ও চাপ থেকে মুক্তি দিতে সাহায্য করে।
নস্টালজিক করে তোলে: বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, দুঃখের গান আমাদের পুরনো স্মৃতি মনে করিয়ে দেয়। বিশেষত জীবনের গুরুত্বপূর্ণ ও অর্থবহ মুহূর্তগুলোর (যেমন স্কুল, কলেজ, প্রথম প্রেম, বিয়ে) স্মৃতি মনে পড়লে মন ভালো হয়ে যায়। নস্টালজিক স্মৃতি আমাদের মেজাজ উন্নত করতে সাহায্য করে।
উদ্বেগ কমায়: সঙ্গীতের মাধ্যমে দুশ্চিন্তা ও উদ্বেগের মতো নেতিবাচক আবেগ দূর হয়। দুঃখের গান শোনার সময় আমরা যখন আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ি, এমনকি কাঁদিও ফেলি, তখন হতাশা ও অন্যান্য নেতিবাচক অনুভূতিগুলো ধুয়ে যায়।
মেজাজ নিয়ন্ত্রণ করা যায়: গানের কথা ও সুর আমাদের মনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। দুঃখের গান শোনার মাধ্যমে আমরা নিজেদের মেজাজকে নিয়ন্ত্রণ করতে শিখি। বিষণ্ণ সুর শ্রোতাকে তাদের কষ্টদায়ক পরিস্থিতি (বিচ্ছেদ, মৃত্যু) থেকে সাময়িকভাবে দূরে সরিয়ে গানের দিকে মনোযোগ দিতে সাহায্য করে।
সঙ্গ দেয়: যখন কেউ তীব্র মানসিক যন্ত্রণার মধ্যে থাকে বা একাকীত্ব অনুভব করে, তখন সঙ্গীত তার পাশে বন্ধুর মতো দাঁড়ায়। দুঃখের গানকে কষ্টের সময়ে এক কাল্পনিক সঙ্গী হিসেবে অনুভব করা যেতে পারে।
গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে গান শোনার মাধ্যমে আমাদের আবেগ, মেজাজ, স্মৃতি এবং মনোযোগ বিশেষভাবে প্রভাবিত হয়। এই কারণেই মানসিক শান্তি পেতে মিউজিক থেরাপি এত কার্যকর। একটি গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের একাংশকে গান শুনতে দেওয়া হয়েছিল এবং অন্য অংশকে মানসিক চাপের জন্য ওষুধ দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে দেখা যায়, যারা গান শুনেছেন তাদের উদ্বেগ ওষুধ গ্রহণকারীদের তুলনায় কম ছিল এবং তাদের শরীরে কর্টিসলের মাত্রাও কম ছিল। এছাড়াও, সঙ্গীত ওষুধের তুলনায় অনেক কম ব্যয়বহুল, শরীরের জন্য ভালো এবং এর কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও নেই।
সুতরাং, মন খারাপ হলে কষ্টের গান শোনা কেবল একটি অভ্যাস নয়, এর পেছনে রয়েছে মনস্তাত্ত্বিক ও বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা। দুঃখের গান আমাদের আবেগ প্রকাশ করতে, সান্ত্বনা দিতে এবং মানসিক শান্তি এনে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।