দৈহিক মিলন কি শুধুই আনন্দ, নাকি এক ধরনের শরীরচর্চাও?

শারীরিক সম্পর্ক বা যৌনমিলন স্বামী-স্ত্রীর বন্ধনকে আরও মজবুত করে, এ কথা সর্বজনবিদিত। শুধু তাই নয়, মানব অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্যও নারী-পুরুষের এই সম্পর্ক অনস্বীকার্য। অনেকেই বলে থাকেন, সহবাস মানেই এক প্রকার শরীরচর্চা। কিন্তু এই তথ্যটি কতটা সঠিক, তা নিয়ে অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে।

আপনি হয়তো জেনে অবাক হবেন, সহবাস কেবল আনন্দই নয়, এটি একটি শরীরচর্চার মাধ্যমও বটে। ব্যায়ামের মতো যৌনকর্মে লিপ্ত হলেও ক্যালরি ক্ষয় হয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই সময় ঠিক কতটুকু ক্যালরি পোড়ে?

গবেষকদের মতে, সহবাসকে হালকা বা পরিমিত শরীরচর্চার সমতুল্য ধরা যেতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, দৌড়ানো বা জিমে ব্যায়াম করার মতো ততটা ক্যালরি যৌনকর্মে ক্ষয় হয় না। এর পরিমাণ নির্ভর করে ব্যক্তির ওজন, যৌনকর্মের স্থায়িত্ব এবং অন্যান্য কিছু বিষয়ের ওপর। সহবাসে শুধু ক্যালরি পোড়ে না, স্বাস্থ্যের আরও অনেক উপকারও হয়। সাম্প্রতিক গবেষণার আলোকে নিচে বিস্তারিত তুলে ধরা হলো।

সহবাসে কত ক্যালরি ক্ষয় হয়?
একটি গবেষণা অনুযায়ী, সহবাসের সময় পুরুষদের গড়ে ১০১ ক্যালরি বা প্রতি মিনিটে ৪.২ ক্যালরি পুড়তে পারে। অন্যদিকে, নারীদের ক্ষেত্রে গড়ে ৬৯ ক্যালরি বা প্রতি মিনিটে ৩.২ ক্যালরি ক্ষয় হতে পারে। সুস্থ ও অল্পবয়সী নারী-পুরুষের ওপর এই গবেষণাটি চালানো হয়েছিল। এই গড় নির্ণয়ে ফোরপ্লে (শরীরের বিভিন্ন অংশে আদর-সোহাগে উত্তেজিত করে তোলা) থেকে অর্গাজম (যৌনসুখের চূড়ান্ত সীমা) পর্যন্ত সময়কাল বিবেচনা করা হয়েছে।

মন্ট্রিলে অবস্থিত ইউনিভার্সিটি অব কুইবেকের ডিপার্টমেন্ট অব এক্সারসাইজ সায়েন্সের অধ্যাপক অ্যান্টনি কারেলিস বলেন, সহবাসের সময় শরীর থেকে যে শক্তি ব্যয় হয়, তা ব্যায়ামের তুলনায় উল্লেখযোগ্য নয়। এই গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের ট্রেডমিলেও শরীরচর্চা করতে বলা হয়েছিল। দেখা গেছে, পুরুষদের প্রতি মিনিটে ৯.২ ক্যালরি এবং নারীদের প্রতি মিনিটে ৭.১ ক্যালরি পুড়েছে। অর্থাৎ, ট্রেডমিলে শরীরচর্চায় সহবাসের তুলনায় দ্বিগুণ ক্যালরি পোড়ে।

আরেকটি গবেষণাতেও একই ধরনের ফলাফল পাওয়া গেছে। যেখানে ৩০ বছর বয়সী পুরুষদের ছয় মিনিটের সহবাসে মাত্র ২১ ক্যালরি পুড়তে পারে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ফোরপ্লে বাদ দিলে সহবাসের গড় স্থায়িত্ব সাধারণত পাঁচ থেকে ছয় মিনিট হয়ে থাকে। ব্যক্তিভেদে এর চেয়ে কম বা বেশি ক্যালরি ক্ষয় হতে পারে।

বেশি ক্যালরি পোড়ানোর উপায়
যদি সহবাসের সময় বেশি ক্যালরি পোড়ানোর ইচ্ছে থাকে, তাহলে আপনাকে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। আপনার পজিশন যদি উপরে হয়, তাহলে নড়াচড়া বেশি হবে এবং শক্তির ক্ষয়ও বেশি হবে। যদি চান নারীর বেশি ক্যালরি পুড়ুক, তাহলে কিছুক্ষণ পর আপনাকে নিচের পজিশনে চলে যেতে হবে। এভাবে উভয়ই উপকৃত হতে পারবেন।

ডা. কারেলিসের মতে, সহবাসের সময় ঘাম নিঃসরণের অর্থ হলো বেশি ক্যালরি ক্ষয় হওয়া।

তবে ইন্ডিয়ানা ইউনিভার্সিটি স্কুল অব পাবলিক হেলথের সেক্সুয়াল অ্যান্ড রিপ্রোডাক্টিভ হেলথের অধ্যাপক ডেবি হার্বেনিক সহবাসের সময় ক্যালরি পোড়ানোর জন্য নির্দিষ্ট সেক্স পজিশনে যাওয়ার বিষয়ে নিরুৎসাহিত করেছেন। তিনি বলেন, সহবাসের অনেক পজিশন রয়েছে, কিন্তু লোকজনের প্রতি আমার পরামর্শ হলো, সেই পজিশনে সহবাস করুন যা উভয়কেই আনন্দ দেয়। এই সময় কত ক্যালরি পুড়বে তা বিবেচনা করবেন না।

তাঁর মতে, ফোরপ্লে করতে করতে শরীরচর্চা করে নিলে ক্যালরি পোড়ানোর পাশাপাশি যৌনমিলনও বেশ উপভোগ্য হতে পারে।

সহবাসের উল্লেখযোগ্য শারীরিক ও মানসিক উপকারিতা:
ক্যালরি ক্ষয় ছাড়াও সহবাসের আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ শারীরিক ও মানসিক উপকারিতা রয়েছে:

ঘুমের মান বাড়ায়
রক্তচাপ কমায়
ব্যথা উপশম করে
পুরুষদের প্রোস্টেট ক্যান্সারের ঝুঁকি কমায়
নারীদের পেলভিস পেশী শক্তিশালী করে
রোগ দমনের ক্ষমতা বাড়ায় (রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়)
মানসিক চাপ ও উদ্বেগ কমায়
মেজাজ ভালো রাখে
আত্মবিশ্বাস বাড়ায়
সুতরাং, সহবাস কেবল শারীরিক তৃপ্তি বা সম্পর্কের গভীরতা বাড়ায় না, বরং এটি সার্বিক সুস্থতার জন্যও বেশ উপকারী। তবে ক্যালরি পোড়ানোর জন্য এটিকে প্রধান শরীরচর্চা হিসেবে বিবেচনা না করে, বরং এর অন্যান্য স্বাস্থ্যগত উপকারিতা ও সম্পর্কের ইতিবাচক দিকগুলোই মূল আকর্ষণ হিসেবে দেখা উচিত।