ক্যান্সার প্রতিরোধে ‘অব্যর্থ দাওয়াই’ ব্যায়াম! ৭.৫ লক্ষ মানুষের উপর দীর্ঘ গবেষণায় মিলল চাঞ্চল্যকর তথ্য

হৃদরোগ এবং ডায়াবেটিসের মতো জীবনশৈলী-সম্পর্কিত রোগের ক্ষেত্রে শরীরচর্চার গুরুত্ব নিয়ে নতুন করে কিছু বলার নেই। তবে এবার এক আন্তর্জাতিক গবেষণাপত্র সামনে আনল এক যুগান্তকারী তথ্য— নিয়মিত ব্যায়াম ক্যান্সারের (Cancer) মতো মারণ রোগকেও উল্লেখযোগ্যভাবে প্রতিরোধ করতে সক্ষম।বন্দিত বিজ্ঞানপত্রিকা ‘জার্নাল অফ ক্লিনিক্যাল অঙ্কোলজি’-তে প্রকাশিত এই গবেষণাটি বিশ্বজুড়ে ক্যান্সার চিকিৎসকদের মধ্যে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। কলকাতার প্রখ্যাত ক্যান্সার বিশেষজ্ঞরা এই গবেষণাকে স্বাগত জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, ব্যায়াম যে ক্যান্সারের ঝুঁকি কমাতে পারে, সেই ধারণা পূর্বে থাকলেও এই প্রথম এত বড় পরিসরে তার জোরালো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ পাওয়া গেল।🔬 গবেষণার চমকপ্রদ ফল: কতটা ব্যায়াম, কতটা সুরক্ষা?মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও অস্ট্রেলিয়ার মোট নয়টি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের ১৩ জন বিজ্ঞানী দীর্ঘ ১০ বছর ধরে এই সমীক্ষাটি পরিচালনা করেন। তাঁরা ৭ লক্ষ ৫৫ হাজারেরও বেশি মানুষের জীবনযাত্রা পর্যবেক্ষণ করে দেখেন, যারা সপ্তাহে আড়াই থেকে পাঁচ ঘণ্টা ব্যায়াম করেন, তাঁদের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের ক্যান্সারের আশঙ্কা উল্লেখযোগ্যভাবে কম।গবেষণায় অংশগ্রহণকারী ৩২ থেকে ৯১ বছর বয়সী এই মানুষের মধ্যে ৫০ হাজার ৬২০ জন গবেষণা চলাকালীন ক্যান্সার আক্রান্ত হন। তবে গবেষকরা লক্ষ্য করেন, নিয়মিত ব্যায়াম কমপক্ষে সাত ধরনের ক্যান্সারের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে সক্ষম। এই ক্যান্সারগুলি এবং ঝুঁকির হ্রাসের হার নিম্নরূপ:ক্যান্সারের প্রকারঝুঁকির হ্রাসের হার (প্রায়)লিভার ক্যান্সার১৮-২৭% পর্যন্ত হ্রাসমায়েলেমা১৪-১৯% পর্যন্ত হ্রাসকিডনি ক্যান্সার১১-১৭% পর্যন্ত হ্রাসনন-হজকিন্স লিম্ফোমা (মহিলা)১১-১৮% পর্যন্ত হ্রাসএন্ডোমেট্রিয়াম ক্যান্সার১০-১৮% পর্যন্ত হ্রাসস্তন ক্যান্সার৬-১০% পর্যন্ত হ্রাসকোলন ক্যান্সার৮-১৪% পর্যন্ত হ্রাস💡 কেন ব্যায়াম ক্যান্সার প্রতিরোধ করে? বিশেষজ্ঞের ব্যাখ্যাবিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই গবেষণার প্রধান কারণ হলো স্থূলতা (Obesity)। ক্যান্সার শল্য-চিকিৎসক গৌতম মুখোপাধ্যায় জানান, গবেষণায় উল্লিখিত সাতটি ক্যান্সার ছাড়াও আরও অনেক ক্যান্সারের সঙ্গে স্থূলতার সরাসরি যোগসূত্র রয়েছে।”ব্যায়াম মেদ কমাতে সহায়ক এবং স্থূলতা প্রতিরোধ করে। স্থূলতা ক্যান্সারের টিউমার বৃদ্ধিতে ইন্ধন যোগায়, বিপরীতে মেদ কমলে বা না থাকলে ক্যান্সার দুর্বল হয়ে পড়ে,” মন্তব্য করেন তিনি।জিনের ভূমিকা: কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের অঙ্কো-মেডিসিন বিভাগের প্রধান চিকিৎসক শিবাশিস ভট্টাচার্য বলেন, স্থূলতা আমাদের শরীরে সুপ্ত ক্যান্সার জিনকে সক্রিয় করে তোলে। নিয়মিত ব্যায়াম সেই জিনকে নিষ্ক্রিয় রাখতে সাহায্য করে। অর্থাৎ, যাদের শরীরে ক্যান্সারের জিন রয়েছে, তারাও নিয়মিত ব্যায়াম করে সেই ক্ষতিকর জিনকে মাথাচাড়া দিতে দেন না।টিউমার কোষে পুষ্টির ঘাটতি: এসএসকেএমের এন্ডোক্রিনোলজি বিভাগের শিক্ষক-চিকিৎসক সতীনাথ মুখোপাধ্যায় ব্যাখ্যা করেন যে, ব্যায়াম শরীরের বিপাক প্রক্রিয়াকে উন্নত করে। এটি পেশীতে পর্যাপ্ত রক্ত সঞ্চালন নিশ্চিত করে, ফলে স্বাভাবিক কোষ পর্যাপ্ত অক্সিজেন পায় এবং কোষস্তরে প্রদাহ হ্রাস পায়। এর ফলে টিউমার কোষ তৈরি হলেও, তারা প্রয়োজনীয় পুষ্টি থেকে বঞ্চিত হয় এবং তাদের বৃদ্ধি ব্যাহত হয়।এই গবেষণা নিঃসন্দেহে ক্যান্সার প্রতিরোধে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করল। চিকিৎসকরা মনে করছেন, এই তথ্য স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধি এবং নিয়মিত ব্যায়ামের অভ্যাস গড়ে তোলার ক্ষেত্রে আরও বেশি গুরুত্ব দেবে।