একটানা হেঁচকি? অবহেলা করবেন না, হতে পারে মারাত্মক রোগের ইঙ্গিত!

হেঁচকি—এই বিরক্তিকর সমস্যাটির অভিজ্ঞতা কমবেশি সকলেরই রয়েছে। এটি খুবই সাধারণ ঘটনা হলেও, একটানা বেশ কিছুক্ষণ ধরে হেঁচকি ওঠা বেশ যন্ত্রণাদায়ক হতে পারে। কারও কারও ক্ষেত্রে জন্মগতভাবেও হেঁচকি ওঠার প্রবণতা দেখা যায়। তবে হেঁচকি ওঠার কারণ শুধু সাধারণ অস্বস্তিই নয়, এটি শারীরিক কিছু রোগের লক্ষণও হতে পারে বলে মনে করছেন চিকিৎসকরা।
ভারতের চিকিৎসক শুদ্ধসত্ত্ব চট্টোপাধ্যায় এ বিষয়ে বিস্তারিত জানিয়েছেন। তিনি বলেন, মধ্যচ্ছদা পেশি (ডায়াফ্রাম) আমাদের শরীরের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এটি বক্ষ গহ্বর থেকে উদর গহ্বরকে পৃথককারী একটি পর্দা, যা ঐচ্ছিক ও অনৈচ্ছিক মাংসপেশি দিয়ে গঠিত। এর ঠিক উপরে হৃদপিণ্ড ও ফুসফুস এবং নিচের দিকে লিভার, পাকস্থলী ও প্লীহার মতো গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ অবস্থিত। এই অঙ্গগুলোর কোনোটিতে সমস্যা দেখা দিলে তা ডায়াফ্রামকে বিরক্ত করতে পারে, যার ফলস্বরূপ হেঁচকি ওঠে।
আসুন, জেনে নেওয়া যাক হেঁচকি ওঠা কোন কোন রোগের লক্ষণ হতে পারে:
১. পাকস্থলীতে অতিরিক্ত বাতাস: অনেকক্ষণ খালি পেটে থাকলে পাকস্থলীতে অতিরিক্ত বাতাস জমা হতে পারে। পাকস্থলী অতিরিক্ত ফুলে গেলে এর উপরের অংশ ডায়াফ্রামকে বিরক্ত করে এবং হেঁচকি শুরু হয়।
২. মশলাদার ও ঝাল খাবার: অতিরিক্ত মসলাযুক্ত ও ঝাল খাবার খেলে পাকস্থলীতে জ্বালা সৃষ্টি হতে পারে। এর ফলে ডায়াফ্রাম একইভাবে বিরক্ত হয় এবং হেঁচকি ওঠে। হঠাৎ করে অতিরিক্ত মরিচ খেলেও একই সমস্যা হতে পারে।
৩. পেপটিক বা গ্যাস্ট্রিক আলসার এবং লিভারের সমস্যা: পেপটিক আলসার বা গ্যাস্ট্রিক আলসারের সমস্যায় হেঁচকি দেখা দিতে পারে। এছাড়াও, লিভার বড় হলে জন্ডিস বা হেপাটাইটিসের মতো রোগেও হেঁচকি ওঠার সম্ভাবনা থাকে।
৪. প্লীহা বৃদ্ধি ও ফুসফুসে জল জমা: প্লীহা বড় হয়ে যাওয়ার কারণেও হেঁচকির উদ্রেক হতে পারে। ম্যালেরিয়া, টাইফয়েডসহ বিভিন্ন রোগের কারণে প্লীহা বড় হতে পারে। হঠাৎ প্লীহা বড় হলে তা ডায়াফ্রামকে বিরক্ত করে হেঁচকি সৃষ্টি করে। একইভাবে, কোনো কারণে ফুসফুসে জল জমলেও এমনটি ঘটতে পারে।
৫. পেরিকার্ডাইটিস: পেরিকার্ডিয়ামে জল জমলে বা পেরিকার্ডাইটিস (হৃদপিণ্ডের বাইরের আবরণে প্রদাহ) হলেও হেঁচকির সমস্যা হতে পারে। ডেঙ্গুর মতো কঠিন রোগেও পেরিকার্ডাইটিস হতে দেখা যায়। অনেক ভাইরাল সংক্রমণের কারণেও এটি হতে পারে।
৬. হৃদরোগ: অনেকের ক্ষেত্রেই হৃদরোগের বিভিন্ন সমস্যার কারণে হেঁচকি উঠতে পারে। কোনো কোনো সময় হৃদস্পন্দন বেড়ে গেলে হেঁচকি দেখা যায়। এমনকি, হার্ট অ্যাটাকের একমাত্র লক্ষণ হিসেবেও হেঁচকি দেখা যেতে পারে, বিশেষত হার্টের নিচের দিকের দেওয়ালে (যা সরাসরি ডায়াফ্রামের সংস্পর্শে আসে) অ্যাটাক হলে।
৭. ভেগাস নার্ভের উদ্দীপনা ও মস্তিষ্কের সমস্যা: কোনো কারণে ভেগাস নার্ভ (দশম ক্র্যানিয়াল নার্ভ) উত্তেজিত হলে হেঁচকি হতে পারে। গলায় কোনো অস্বস্তি হলেও অনেক সময় হেঁচকি ওঠে। মস্তিষ্কের মেডুলা অংশে কোনো সমস্যা মারাত্মক হতে পারে এবং কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের কারণও হতে পারে।
৮. জন্মগত কারণ: অনেকের ক্ষেত্রেই জন্মগতভাবে বারবার হেঁচকি ওঠার প্রবণতা দেখা যায়।
৯. কিডনির সমস্যা: হেঁচকি কিডনির সমস্যারও ইঙ্গিত হতে পারে।
১০. আবেগ: অতিরিক্ত আবেগতাড়িত হয়ে পড়লেও অনেকের হেঁচকি উঠতে দেখা যায়।
হেঁচকির সমস্যাকে কখনোই সাধারণ ভেবে অবহেলা করা উচিত নয়। এর পেছনে লুকিয়ে থাকতে পারে বিভিন্ন গুরুতর শারীরিক কারণ। তাই একটানা বা ঘন ঘন হেঁচকি উঠলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।