মেয়েদের মূত্রনালীর সংক্রমণ (UTI): কারণ, লক্ষণ ও ঘরোয়া প্রতিকার

বর্তমান সময়ে মেয়েদের মধ্যে মূত্রনালীর সংক্রমণ বা ইউনারি ট্র্যাক্ট ইনফেকশন (UTI) একটি অত্যন্ত সাধারণ রোগ। মূত্র তৈরি এবং দেহ থেকে তা নিঃসরণের জন্য যে অঙ্গগুলো কাজ করে, সেগুলোতে কোনো কারণে ইনফেকশন দেখা দিলেই তাকে ইউটিআই বলা হয়। একটু সতর্ক হলে এবং সঠিক সময়ে চিকিৎসা নিলে এই সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।

ইউটিআইয়ের কারণ কী?
বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ব্যাকটেরিয়া (৯৫%) এই সংক্রমণের জন্য দায়ী। কিছু ক্ষেত্রে ফাঙ্গাস, প্রোটিয়াস, কেবসিয়েলা, সিউডোমনাস-এর মতো জীবাণুও দায়ী হতে পারে। এছাড়াও কিছু নির্দিষ্ট কারণ ইউটিআইয়ের ঝুঁকি বাড়িয়ে তোলে:

দীর্ঘসময় মূত্রতন্ত্রে জীবাণু অবস্থান: জীবাণু মূত্রতন্ত্রে বেশিদিন থাকলে ইউটিআইয়ের লক্ষণ দেখা যায়।
মেয়েদের শারীরিক গঠন: মেয়েদের মূত্রনালীর দৈর্ঘ্য ছোট (মাত্র ১.৫ ইঞ্চি, যেখানে ছেলেদের ৮ ইঞ্চি), যা জীবাণুকে সহজে প্রবেশ করতে সাহায্য করে।
মূত্রদ্বার ও যোনিপথের নৈকট্য: মেয়েদের মূত্রদ্বার ও যোনিপথ খুব কাছাকাছি হওয়ায় মাসিক ঋতুস্রাবের সময় অপরিষ্কার কাপড় ব্যবহারের ফলে জীবাণু যোনিপথে ও পরে মূত্রনালীকে সংক্রমিত করতে পারে।
প্রস্রাব আটকে রাখা: প্রস্রাব চেপে রাখার প্রবণতা মেয়েদের মধ্যে বেশি হওয়ায় সংক্রমণ হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে।
কম জল পান: যারা পর্যাপ্ত জল পান করেন না, তাদের এই ঝুঁকি বেশি।
অন্যান্য স্বাস্থ্যগত অবস্থা: ডায়াবেটিস, ষাটের বেশি বয়স এবং যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম, তাদের ক্ষেত্রে ইউটিআই হওয়ার প্রবণতা বেশি। প্রস্টেট গ্রন্থি বড় হলেও পুরুষদের ইউটিআই হতে পারে।
ইউটিআইয়ের সাধারণ লক্ষণসমূহ
ইউটিআইয়ের কিছু সাধারণ লক্ষণ নিচে দেওয়া হলো:

ঘন ঘন প্রস্রাব হওয়া।
প্রস্রাবের প্রচণ্ড চাপ অনুভব করা।
প্রস্রাবের সময় ব্যথা, জ্বালাপোড়া ও অসহ্য অনুভূতি।
তলপেটে স্বাভাবিকভাবে অথবা চাপ দিলে ব্যথা অনুভব।
ঘন, ফেনার মতো অথবা দুর্গন্ধযুক্ত প্রস্রাব।
জ্বর-কাঁপুনিসহ অথবা কাঁপুনি ছাড়া।
বমি বমি ভাব ও বমি হওয়া।
কোমরের পাশের দিকে অথবা পিছনে মাঝামাঝি অংশে ব্যথা।
প্রস্রাবের চাপে রাতে বার বার ঘুম ভেঙে যাওয়া।
চিকিৎসা ও প্রতিরোধ
ইউটিআইয়ের চিকিৎসায় চিকিৎসকরা সাধারণত সেফালোস্পরিন, লিভোফ্লক্সাসিন, গ্যাটিফ্লক্সাসিন ইত্যাদি অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করেন, যা ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণের ক্ষেত্রে ৯৬% কার্যকর। যদি ফাঙ্গাসের কারণে সংক্রমণ হয়, তবে অ্যান্টি-ফাংগাল ড্রাগস দেওয়া হয়। বাহ্যিক চুলকানি থাকলে অ্যান্টি-ফাংগাল বা করটিকস্টারয়েড জাতীয় ক্রিম এবং বেশি ব্যথা থাকলে নিউরোস্পাস্মটিক ঔষধ আরামদায়ক হতে পারে। পুনরাবৃত্তি সংক্রমণ এড়াতে অনেক সময় সহবাস সঙ্গীকেও প্রতিষেধক অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে।

সাধারণত, সঠিক চিকিৎসা হলে ইউটিআই ২-৩ দিনেই ভালো হয়ে যায়। তবে কমপ্লিকেটেড ইউটিআই (যাদের বারবার ইউটিআই হয়, যাদের সেক্সুয়াল অভ্যাস স্বাভাবিক নয়, সাথে ডায়াবেটিস বা অন্যান্য অসুখ আছে) ভালো হতে ১-২ সপ্তাহ সময় লাগতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে শিরা পথে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করতে হতে পারে, এমনকি হাসপাতালে ভর্তিও থাকতে হতে পারে। মনে রাখবেন, রোগের লক্ষণ উপশম হওয়া মানেই রোগমুক্তি নয়, চিকিৎসক যতদিন চিকিৎসা চালাতে বলবেন ততদিন তা চালিয়ে যেতে হবে। কমপ্লিকেটেড ইউটিআইতে সাধারণত ৩-৪ সপ্তাহ ওষুধ খেতে হয়।

সতর্কতা: কোনো ওষুধই রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া সেবন করা উচিত নয়।

ইউটিআই প্রতিরোধের কিছু গুরুত্বপূর্ণ টিপস:
চিকিৎসার চেয়ে প্রতিরোধই যেকোনো রোগের ক্ষেত্রে সর্বোৎকৃষ্ট উপায়। ইউটিআই প্রতিরোধের জন্য কিছু টিপস:

পর্যাপ্ত জল পান: দিনে বারবার জল ও অন্যান্য তরল যেমন ফ্রুট জুস, ডাবের জল ইত্যাদি পান করুন। জল ও অন্যান্য তরল জীবাণুর সংক্রমণ ও বৃদ্ধি প্রতিহত করে মূত্রতন্ত্রকে পরিষ্কার রাখে।
সঠিক পরিচ্ছন্নতা: বাথরুম ব্যবহারের পর টয়লেট টিস্যু পিছন থেকে সামনের দিকে না এনে সামনে থেকে পিছনের দিকে ব্যবহার করুন, যাতে মলদ্বারের জীবাণু মূত্রপথে এসে সংক্রমণ ঘটাতে না পারে।
যৌন স্বাস্থ্যবিধি: যৌন সহবাসের আগে ও পরে অবশ্যই প্রস্রাব করুন, যাতে মূত্রনালীতে আসা সকল জীবাণু পরিষ্কার হয়। যাদের সহবাসের পর ইউটিআই শুরু হয়, তারা চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ইউটিআই প্রতিরোধক অ্যান্টিবায়োটিক সহবাসের পর নিতে পারেন।