মস্তিষ্কের পর্দা বা মেনিনজেসে কোনো সমস্যা হলে, মাথার হাড়ের মধ্যকার সাইনাসে প্রদাহ (সাইনো সাইটিস) হলে কিংবা মস্তিষ্কের রক্তনালিতে কোনো সমস্যা দেখা দিলে মাথাব্যথা হয়ে থাকে। আবার মাথার পেশি বা ত্বকের কোনো সমস্যা হলেও মাথাব্যথা হয়। অল্প কিছু ক্ষেত্রে মাথাব্যথার কারণ হতে পারে মস্তিষ্কের টিউমার। এ ছাড়া চোখ, কান, নাক ও চোয়ালের জয়েন্টের সমস্যাতেও মাথাব্যথা হতে পারে। এসব নির্দিষ্ট কারণ ছাড়া দুশ্চিন্তাতেও মাথাব্যথা হয়, আবার মাইগ্রেনের ব্যথাও হয়। করোনা রোগীও নানান কারণে মাথাব্যথায় ভুগতে পারেন। শরীরে নানান জীবাণুর সংক্রমণেই হতে মাথাব্যথা।
মাইগ্রেনের ব্যথা কপালের একপাশে হয়ে থাকে, তবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে ধীরে ধীরে ব্যথা ছড়িয়ে পড়তে পারে। সঙ্গে থাকতে পারে বমিভাব কিংবা বমি, আলো বা শব্দে খারাপ লাগা। ৪ থেকে ৭২ ঘণ্টা পর্যন্ত ব্যথা থাকতে পারে। কোনোও কোনোও ক্ষেত্রে মাথাব্যথা শুরু হওয়ার আগে কিছু লক্ষণ দেখা যায়, যেমন-চোখের সামনে আলোজাতীয় কিছু দেখা, শরীরের একপাশ ঝিনঝিন করা প্রভৃতি। মাইগ্রেনের সঠিক কারণ জানা যায়নি। তবে পনির, চকলেট, কফি, অনিদ্রা, দুশ্চিন্তা, দুর্গন্ধ, দীর্ঘসময় খালি পেটে থাকা, অতিরিক্ত আলো বা রোদ কিংবা খুব কম আলো, অতিরিক্ত শব্দের মতো কিছু বিষয় মাইগ্রেনের ব্যথাকে জাগিয়ে তুলতে পারে।
কোনো রোগীর কোনো বিষয়টিতে মাথাব্যথার প্রবণতা বাড়ছে, তা তিনি নিজেই বুঝতে পারেন। ওই বিশেষ জিনিসটি এড়িয়ে চললে তাঁর মাথাব্যথা নিয়ন্ত্রণে থাকে। তবে সব লক্ষণ সবার থাকে না। মাইগ্রেনেরও রয়েছে শ্রেণিবিভাগ। মাইগ্রেনের ব্যথা যে কারওই হতে পারে, তবে তরুণীদের মধ্যে এ রোগ বেশি দেখা যায় (হরমোনের সঙ্গে কিছু সংশ্লিষ্টতার কারণে)।
মাথাব্যথা হলে নিউরোলজিস্টের শরণাপন্ন হওয়া উচিত। মাথাব্যথা একটি উপসর্গ মাত্র। ব্যথা কমাতে ওষুধ সেবনের চেয়ে ব্যথার পেছনে দায়ী কারণটাকে খুঁজে বের করে সেটির চিকিৎসা করানোই বেশি দরকার। তবে মাথাব্যথা হলেই টিউমারজাতীয় সমস্যা বা স্ট্রোকের কথা ভেবে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। টিউমারের ক্ষেত্রে সাধারণত সকালের দিকে মাথাব্যথা হয়, মাথার অবস্থানের পরিবর্তনে (যেমন-মাথা ঝোঁকানো) ব্যথা হতে পারে, বমি হতে পারে, খিঁচুনি হতে পারে, শরীরের একপাশ অবশ হয়ে আসতে পারে বা ঝিনঝিন করতে পারে, এমনকি রোগী অজ্ঞানও হয়ে যেতে পারেন।
রক্তক্ষরণজনিত স্ট্রোকের ক্ষেত্রে তীব্র মাথাব্যথা, ঘাড় শক্ত হয়ে যাওয়া, বমি কিংবা খিঁচুনি হওয়া, শরীরের একপাশ অবশ হয়ে যাওয়া, অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দেয়। এ ধরনের সমস্যা দেখা দিলে অতিসত্বর চিকিৎসা নেওয়া প্রয়োজন।
তাই মাথাব্যথা হলেই সিটিস্ক্যান, এমআরআই বা আরও জটিল পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে হবে, বিষয়টা এ রকম নয়। ব্যথার তীব্রতা ও আনুষঙ্গিক লক্ষণ অনুযায়ী রোগ নির্ণয় করেন চিকিৎসক, প্রয়োজন হলে কিছু ক্ষেত্রে এসব পরীক্ষা করতে বলা হয়। দুশ্চিন্তাজনিত মাথাব্যথাই সবচেয়ে বেশি হয়ে থাকে, যেটির চিকিৎসায় সাইকোথেরাপি এবং কিছু ওষুধ সেবনের প্রয়োজন হয়ে থাকে।
দুশ্চিন্তাজনিত মাথাব্যথা এবং মাইগ্রেনের ক্ষেত্রে ব্যথাকালীন চিকিৎসা এবং ব্যথা প্রতিরোধী চিকিৎসা – এই দু’টি আলাদা ভাগ রয়েছে। প্রতিরোধমূলক চিকিৎসা না নিয়ে কেবল ব্যথা প্রতিকারের ওষুধ সেবন করলে কিন্তু কাজে দেবে না, বরং ব্যথার তীব্রতা বাড়তে থাকবে এবং ঘন ঘন ব্যথা হবে, রোগী একসময় ওষুধ-নির্ভর হয়ে পড়বেন। আর যেসব ব্যথার কোনো নির্দিষ্ট কারণ থাকে, সেগুলোর ক্ষেত্রে কারণটি নির্ণয় করে চিকিৎসা করালে ব্যথা ভালো হয়ে যায়। এ ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি মাথাব্যথা হতাশার জন্ম দিতে পারে, তাই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই ভালো।