বিশ্ব ডিম্বাশয় ক্যান্সার দিবস: নীরব ঘাতকের বিরুদ্ধে সচেতনতা বৃদ্ধির অঙ্গীকার

আজ বিশ্ব ডিম্বাশয় ক্যান্সার দিবস। প্রতি বছর এই দিনটি পালিত হয় নারীদের মধ্যে ডিম্বাশয় ক্যান্সার সম্পর্কে সচেতনতা ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য। ক্রমশ বাড়ছে এই রোগের ঝুঁকি। ডিম্বাশয়ের ক্যান্সার বিশ্বে নারীদের মধ্যে অষ্টম সাধারণ ক্যান্সার হিসেবে পরিচিত। প্রতি বছর প্রায় ৩ লক্ষ ২৪ হাজার মহিলার শরীরে এই রোগ বাসা বাঁধে এবং এর মধ্যে ২ লক্ষ ৭ হাজার জন প্রাণ হারান। এই ভয়াবহ পরিসংখ্যানের নিরিখে ডিম্বাশয়ের ক্যান্সারের লক্ষণ এবং চিকিৎসা সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান প্রচার করা অত্যন্ত জরুরি। এর মাধ্যমেই বাঁচানো যেতে পারে অসংখ্য নারীর জীবন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কিছু সাধারণ লক্ষণ শরীরে ক্রমাগত দেখা দিলে তা একেবারেই উপেক্ষা করা উচিত নয় এবং দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। আসুন জেনে নেওয়া যাক সেই গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণগুলি:
ডিম্বাশয়ের ক্যান্সারের সাধারণ লক্ষণ যা মহিলারা প্রায়শই উপেক্ষা করেন:
ক্রমাগত ফোলাভাব: পেটে একটানা অস্বস্তি এবং ফোলাভাব দেখা দিলে তাকে হালকাভাবে নেওয়া উচিত নয়। সামান্য খাবার গ্রহণের পরই পেট ভরা ও টানটান অনুভূত হওয়া, পেট অস্বাভাবিকভাবে বড় লাগা এবং কিছুতেই না কমা – এগুলো সাধারণ পেট ফাঁপা বা কোষ্ঠকাঠিন্যের লক্ষণ নাও হতে পারে।
শ্রোণী বা পেটে ব্যথা: তলপেটের অংশে, জরায়ুর আশেপাশে लगातार অস্বস্তি বা ব্যথা অনুভূত হওয়া অথবা ঐ অংশটি সর্বদা সংবেদনশীল বোধ করলে দ্রুত ডাক্তারের সঙ্গে যোগাযোগ করা আবশ্যক।
খেতে অসুবিধা: অল্প খাবারেই পেট ভরে যাওয়া অথবা খাবার গ্রহণে অনীহা বা অসুবিধা বোধ করা ডিম্বাশয়ের ক্যান্সারের একটি লক্ষণ হতে পারে।
প্রস্রাবে লক্ষণ: ঘন ঘন প্রস্রাবের বেগ অনুভব করা এবং প্রস্রাবের ধরণ, রঙ বা প্রবাহে কোনও পরিবর্তন লক্ষ্য করলে তা অবহেলা করা উচিত নয়। অনেক মহিলাই এই লক্ষণকে ইউটিআই বা ডায়াবেটিসের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলেন। তবে, ডিম্বাশয়ের ক্যান্সার কোষ মূত্রাশয়ের দেওয়ালে বৃদ্ধি পেলে তার উপর চাপ সৃষ্টি হয় এবং ঘন ঘন প্রস্রাবের প্রয়োজন অনুভূত হতে পারে।
ক্লান্তি এবং দুর্বলতা: ডিম্বাশয়ের ক্যান্সার শরীরে অস্বাভাবিক ক্লান্তি ও দুর্বলতা সৃষ্টি করতে পারে। ক্যান্সার কোষগুলি হরমোনের মাত্রা এবং প্রোটিনের ভারসাম্যে পরিবর্তন ঘটায়। এর ফলে শরীরে ফোলাভাব এবং অসহ্য ব্যথা অনুভূত হতে পারে।
পিঠে ব্যথা: পিঠের ব্যথা সব সময় ভুল অঙ্গবিন্যাসের কারণে হয় না। যদি পিঠের ব্যথা আপনার ঘুম ও শান্তি কেড়ে নেয়, তবে সতর্ক থাকুন। পেলভিসের আশেপাশে তরল জমা হতে শুরু করলে তা পিঠের নিচের অংশের টিস্যুতে সমস্যা সৃষ্টি করে এবং ব্যথা বাড়ায়। তাই একটানা অসহ্য পিঠের ব্যথাকে উপেক্ষা করা উচিত নয়।
মাসিক চক্রের পরিবর্তন: পিরিয়ড চক্রে আকস্মিক পরিবর্তন, যেমন – কখনও কম বা কখনও বেশি রক্তপাত হলে, সেই বিষয়ে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
মেনোপজের পরে রক্তপাত: মেনোপজ বা ঋতুবন্ধের পরে যোনিপথে রক্তপাত হওয়া স্বাভাবিক নয়। এটি ডিম্বাশয়ের ক্যান্সারের একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্ক সংকেত, এবং এক্ষেত্রে দ্রুত ডাক্তারের সঙ্গে যোগাযোগ করা অত্যাবশ্যক।
ডিম্বাশয়ের ক্যান্সারের কারণ:
ডিম্বাশয়ের ক্যান্সারের জন্য একাধিক কারণ দায়ী থাকতে পারে। তার মধ্যে কিছু প্রধান কারণ নিচে উল্লেখ করা হলো:
কিছু মহিলার পরিবারে ডিম্বাশয়, স্তন বা কোলোরেক্টাল ক্যান্সারের ইতিহাস থাকলে তাঁদের এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে।
বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে ডিম্বাশয়ের ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ে, বিশেষত পেরিমেনোপজ বা মেনোপজের পরে।
যেসব মহিলা কখনও গর্ভধারণ করেননি বা কুমারী, তাঁদের ডিম্বাশয়ের ক্যান্সারের ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে বেশি হতে পারে। এর কারণ হিসেবে মনে করা হয়, ডিম্বস্ফোটনের কারণে কিছু অনিষিক্ত ডিম্বাণু জরায়ুতে থেকে যাওয়ায় ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ে।
হরমোন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপি (HRT) এবং উর্বরতা চিকিৎসার সময় ব্যবহৃত হরমোন থেরাপি ডিম্বাশয়ের ক্যান্সারের ঝুঁকি বৃদ্ধি করতে পারে।
স্থূলতা এবং থাইরয়েডের মতো হরমোনজনিত সমস্যা ডিম্বাশয়ের ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
বিশ্ব ডিম্বাশয় ক্যান্সার দিবসে আমাদের অঙ্গীকার হোক, প্রতিটি নারীর কাছে এই রোগের লক্ষণ ও কারণ সম্পর্কে সঠিক তথ্য পৌঁছে দেওয়া। নীরব ঘাতক ডিম্বাশয় ক্যান্সার সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করে আমরা লক্ষ লক্ষ নারীর জীবন রক্ষা করতে পারি। তাই, কোনও লক্ষণ উপেক্ষা না করে সময় মতো স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানো অত্যন্ত জরুরি।