বাড়ছে মারণ রোগ ক্যান্সার, সচেতন হোন ডিম্বাশয়ের ক্যান্সার নিয়েও

প্রতি বছর বিশ্বজুড়ে লক্ষ লক্ষ মানুষ ক্যান্সারের মতো ভয়াবহ রোগে প্রাণ হারান। সময়ের সাথে সাথে এই মারণ রোগের ঝুঁকি ক্রমশ বাড়ছে। আগে যেখানে মূলত বয়স্করাই এই রোগে আক্রান্ত হতেন, বর্তমানে শিশুরাও এর শিকার হচ্ছে। চিকিৎসা বিজ্ঞান এই মারাত্মক রোগ এবং এর নিরাময় নিয়ে প্রতিনিয়ত গবেষণা করছে। ফলস্বরূপ, এখন ক্যান্সার শনাক্তকরণ এবং চিকিৎসা আগের তুলনায় অনেক সহজ হয়েছে।
বিশ্বজুড়ে মহিলাদের মধ্যে ডিম্বাশয়ের ক্যান্সার নিয়ে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রতি বছর ৮ মে পালিত হয় ‘বিশ্ব ডিম্বাশয় বা ওভারিয়ান ক্যান্সার দিবস’। এই রোগের প্রাথমিক পর্যায়ে তেমন কোনো সুস্পষ্ট লক্ষণ দেখা যায় না, যার ফলে রোগ নির্ণয় কঠিন হয়ে পড়ে এবং পরিস্থিতি ক্রমশ গুরুতর হতে পারে।
ডিম্বাশয়ের ক্যান্সার মূলত ডিম্বাশয় অথবা ফ্যালোপিয়ান টিউবের অস্বাভাবিক কোষের অনিয়ন্ত্রিত বৃদ্ধি। এটি ডিম্বাশয় থেকেই শুরু হয় এবং পরবর্তীতে পেলভিস, লিম্ফ নোড, পেট, অন্ত্র, বুক বা যকৃতেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ডিম্বাশয়ের ক্যান্সার মহিলাদের মধ্যে সপ্তম সর্বাধিক সাধারণ ক্যান্সার এবং অন্যান্য প্রজননতন্ত্রের ক্যান্সারের তুলনায় এটি বেশি প্রাণঘাতী। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মহিলাদের ক্যান্সারজনিত মৃত্যুর পঞ্চম প্রধান কারণ এই রোগ। আসুন জেনে নেওয়া যাক ডিম্বাশয়ের ক্যান্সারের লক্ষণ, কারণ এবং প্রতিরোধের উপায় সম্পর্কে বিস্তারিত।
ভারতে ডিম্বাশয়ের ক্যান্সারের চিত্র:
ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অফ মেডিকেল রিসার্চের ২০১৯ সালের রিপোর্ট অনুযায়ী, ডিম্বাশয়ের ক্যান্সার ভারতীয় মহিলাদের মধ্যে তৃতীয় সর্বাধিক সাধারণ এবং বিশ্বব্যাপী অষ্টম সর্বাধিক সাধারণ ক্যান্সার। GLOBOCAN ২০১৮-এর তথ্য অনুসারে, সমস্ত ক্যান্সারের মধ্যে ডিম্বাশয়ের ক্যান্সারের হার ৩.৪৪ শতাংশ। ভারতে মহিলাদের ক্যান্সারজনিত মৃত্যুর এটি একটি প্রধান কারণ, যা মোট ক্যান্সার মৃত্যুর ৩.৩৪ শতাংশ।
ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিকের তথ্য অনুযায়ী, ডিম্বাশয়ের ক্যান্সারের সুনির্দিষ্ট কারণ এখনও অজানা। তবে স্থূলতা, ৬০ বছরের বেশি বয়স, ডিম্বাশয়ের ক্যান্সারের পারিবারিক ইতিহাস, এন্ডোমেট্রিওসিস এবং সন্তানধারণ না করা এর ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
ডিম্বাশয়ের ক্যান্সারের কিছু প্রাথমিক লক্ষণ:
ফুলে যাওয়া: অল্প খাবার খাওয়ার পরেও যদি পেট ফোলা বা শক্ত অনুভব হয় এবং দীর্ঘ সময় ধরে পেট অস্বাভাবিকভাবে বড় দেখাতে থাকে, তবে হজমের সমস্যা ভেবে এড়িয়ে যাওয়া উচিত নয়। এটি ডিম্বাশয়ের ক্যান্সারের লক্ষণ হতে পারে।
ঘন ঘন প্রস্রাব: বার বার প্রস্রাবের বেগ পাওয়াকে অবহেলা করা উচিত নয়। অনেক মহিলা এটিকে ডায়াবেটিস বা ইউটিআই ভেবে ভুল করেন। তবে এটি টিউমারের চাপের কারণেও হতে পারে।
পেলভিক ব্যথা: তলপেটে যেকোনো ধরনের অস্বস্তি ক্রমশ বাড়তে থাকা টিউমারের লক্ষণ হতে পারে। যদিও পিরিয়ডের সময় ব্যথা স্বাভাবিক, তবে অন্য সময়ে এই ব্যথা অনুভব করলে গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
কম খিদে: ডিম্বাশয়ের ক্যান্সারের কারণে পেট ফোলা বা ভরা অনুভব হওয়ায় ক্ষুধামান্দ্য দেখা দিতে পারে।
পিঠে ব্যথা: ভুল ভঙ্গিতে বসা বা ঘুমানোর কারণে পিঠে ব্যথা হওয়া স্বাভাবিক। তবে যদি প্রায়শই পিঠে ব্যথা অনুভব হয়, তবে এটি ডিম্বাশয়ের ক্যান্সারের প্রাথমিক লক্ষণ হতে পারে।
মাসিক চক্রের পরিবর্তন: মহিলাদের তাদের মাসিক চক্রের দিকে খেয়াল রাখা উচিত। যদি প্রতি মাসে পিরিয়ড খুব তাড়াতাড়ি বা দেরিতে হয়, তবে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
মেনোপজের পরে রক্তপাত: মেনোপজের পরেও রক্তপাত হওয়া স্বাভাবিক নয়। এটি ডিম্বাশয়ের ক্যান্সারের লক্ষণ হতে পারে এবং এক্ষেত্রে দ্রুত ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
ডিম্বাশয়ের ক্যান্সারের কারণসমূহ:
ডিম্বাশয়ের ক্যান্সার যেকোনো বয়সের মহিলাদের হতে পারে। তবে ৫৫ বছর বা তার বেশি বয়সী মহিলাদের এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। এছাড়াও, যদি কোনও মহিলার ডিম্বাশয়, স্তন বা কোলোরেক্টাল ক্যান্সারের পারিবারিক ইতিহাস থাকে, তবে ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়। যারা কখনও মা হননি বা গর্ভধারণ করেননি, তাদেরও ডিম্বাশয়ের ক্যান্সারের ঝুঁকি বেশি থাকতে পারে। স্থূলতা এবং থাইরয়েডের মতো হরমোনজনিত সমস্যাও ডিম্বাশয়ের ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
এটি এড়াতে কী করবেন?
ডিম্বাশয়ের ক্যান্সার সম্পূর্ণরূপে প্রতিরোধের কোনো নির্দিষ্ট উপায় নেই। তবে পারিবারিক ইতিহাস জানা থাকলে এবং প্রাথমিক লক্ষণগুলো সম্পর্কে সচেতন থাকলে এর ঝুঁকি কমানো যেতে পারে।
ডিম্বাশয়ের ক্যান্সারের চিকিৎসা:
যদি কারও ডিম্বাশয়ের ক্যান্সার ধরা পড়ে, তবে চিকিৎসক অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে এর চিকিৎসা করতে পারেন। এছাড়াও, ল্যাপারোস্কোপিক সার্জারি বা স্টেজিং বায়োপসির পাশাপাশি কেমোথেরাপি, সার্জারি, হরমোন থেরাপি ও টার্গেটেড থেরাপির মাধ্যমেও এর চিকিৎসা করা সম্ভব। ডিম্বাশয়ের ক্যান্সারের কোনো লক্ষণ দেখা গেলে অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার মাধ্যমে এবং এই রোগ সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমেই ডিম্বাশয়ের ক্যান্সারের ভয়াবহতা থেকে অনেক জীবন বাঁচানো সম্ভব। তাই নিজে সচেতন হন এবং অন্যান্য মহিলাদেরও এই বিষয়ে অবগত করুন।