১৯৯৫-এর সেই প্রথম চিঠি থেকে আজীবন ভালোবাসা! জুবিন গর্গের কোন গোপন অধ্যায় ফাঁস করলেন তাঁর স্ত্রী?

সংগীত জগতের নক্ষত্রপতন ঘটে গেলেও তাঁর সুর এবং সৃষ্টির রেশ আজও অনুরাগীদের হৃদয়ে একইভাবে দোলা দিয়ে যায়। পর্দায়, মঞ্চে কিংবা সুরের জাদুতে যাঁকে যতটা চিনে নেওয়া যায়, ব্যক্তিগত জীবনের মানুষটিকে হয়তো ততটা চেনা হয়ে ওঠে না। সেই অচেনা দিকটাকে আলোর সামনে আনার জন্যই কখনও কখনও একটি সাক্ষাৎকার হয়ে ওঠে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও আবেগঘন। প্রয়াত কিংবদন্তি শিল্পী জুবিন গর্গের (Zubeen Garg) ক্ষেত্রেও ঠিক তেমনই এক বিরল অভিজ্ঞতা শেয়ার করলেন তাঁর অর্ধাঙ্গিনী গরিমা সাইকিয়া গর্গ। আসামের গণ্ডি পেরিয়ে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে জুবিনের যে এক আত্মিক ও গভীর টান ছিল, তা আজ আর কারোর অজানা নয়। তাঁর আকস্মিক প্রয়াণের পর গোটা দেশ যেভাবে স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিল, তার রেশ এখনও কাটেনি। মানুষটা নেই, কিন্তু তাঁর গান আর সৃষ্টির মাঝেই তিনি আজও অমর হয়ে বেঁচে আছেন। এবার স্বামীর সবচেয়ে কাছের মানুষ ও স্ত্রী গরিমার জবানিতে উঠে এল এক অন্য জুবিনের অজানা গল্প, যাঁকে হয়তো তাঁর সাধারণ অনুরাগীরা খুব একটা কাছে থেকে দেখার সুযোগ পাননি।
কলকাতায় একটি বিশেষ ছবির শুটিংয়ের সূত্রে এসে সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে গরিমা স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে, ‘লাভ ইউ জুবিনদা’ ছবিটিকে তিনি স্রেফ একটি গতানুগতিক শ্রদ্ধাঞ্জলি হিসেবে দেখতে নারাজ। বরং এই চলচ্চিত্রের মধ্য দিয়ে তিনি দেখতে পাচ্ছেন বাংলার সাধারণ মানুষের নিঃশর্ত ভালোবাসা, বাঙালি সংস্কৃতির প্রতি জুবিনের আজীবন ভক্তি এবং বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা তাঁর অগণিত ভক্তদের আবেগ। গরিমার আবেগঘন কথায় স্পষ্ট, “এটি কেবল জুবিন গর্গের প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি নয়; এটি বাংলার মানুষের ভালোবাসা এবং সংস্কৃতির এক অনন্য প্রতিফলন। পশ্চিমবঙ্গের মানুষ ও বাংলা ভাষার প্রতি জুবিনের যে গভীর টান ছিল, তা এই চলচ্চিত্রে জীবন্ত হয়ে উঠেছে।” কলকাতার সঙ্গে এই পরিবারের সম্পর্ক বহু পুরোনো। অতীতে বহু শো এবং নানা অনুষ্ঠানে এই শহরে আসার সুবাদে এখানকার মানুষের সঙ্গে এক অপূর্ব পারিবারিক বন্ধন তৈরি হয়েছিল। জুবিন নিজে গর্ব করে বলতেন, “আমি তো অর্ধেক বাঙালি।” করিমগঞ্জ ও শিলচরে বাঙালি পরিমণ্ডলে তাঁর শৈশব কাটায় বাঙালিয়ানা তাঁর রক্তে মিশে ছিল। তাই কলকাতায় এলে গরিমাও নিজেকে কখনও কোনো দিন বাইরের মানুষ বলে মনে করেন না।
তবে তারকা ‘জুবিন গর্গ’-এর আড়ালে লুকিয়ে থাকা অন্য মানুষটিকে শুধু চিনতেন তাঁর স্ত্রী গরিমা। ভালোবেসে তিনি স্বামীকে কোনো দিন ‘জুবিন’ বলে ডাকতেন না, তাঁর কাছে তিনি ছিলেন কেবল ‘গোল্ডি’। এই ছোট্ট একটি ডাকনামের আড়ালেই লুকিয়ে রয়েছে তাঁদের দীর্ঘ দাম্পত্য জীবনের সবচেয়ে ব্যক্তিগত ও সুন্দর অধ্যায়। সালটা ১৯৯৫, আজ থেকে প্রায় ৩১ বছর আগের কথা। তখন মাত্র ২৩ বছরের এক তরুণ জুবিন প্রথমবার গরিমার হোস্টেলে দেখা করতে এসেছিলেন। তার ঠিক আগেই গরিমা তাঁকে একটি ফ্যানমেল বা চিঠি লিখেছিলেন, যেখানে তিনি জুবিনের সাড়া জাগানো ‘অনামিকা’ ও ‘মায়া’ অ্যালবামের ভূয়সী প্রশংসা করেছিলেন। চিঠিতে তিনি লিখেছিলেন যে জুবিনের সুরের জাদু নতুন প্রজন্মকে জাদুমুগ্ধ করেছে এবং বিশ্বাস প্রকাশ করেছিলেন যে একদিন এই তরুণ এক বিশাল সংগীত তারকা হয়ে উঠবেন। প্রথম দেখাতেই লম্বা চুল ও তীক্ষ্ণ চোখের সেই যুবকের সঙ্গে যেন কোনো এক জন্মান্তরের চেনা যোগ অনুভব করেছিলেন গরিমা। এরপর কেটে গেছে দীর্ঘ তিন দশক। এসেছে অগাধ সাফল্য, খ্যাতি, অজস্র গান আর ব্যস্ততার পাহাড়।
কিন্তু এতকিছুর পর সেই ব্যস্ত মানুষটি যখন হঠাৎ চিরতরে বিদায় নিলেন, তখন গরিমার জীবনে তৈরি হলো এক বিশাল ও অপূরণীয় শূন্যতা। অকপটে তিনি জানান, স্বামীর মৃত্যুর পর প্রথম কয়েক মাস তিনি বুঝতেই পারতেন না কীভাবে নিজের জীবনটাকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাবেন। জুবিনের জীবনযাত্রার গতি ছিল অত্যন্ত তীব্র, যেখানে সবসময় অজস্র মানুষ, নানা দায়িত্ব এবং কাজের ব্যস্ততা লেগেই থাকত। ফলে মানসিকভাবে তিনি সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছিলেন। তবুও সেই চরম শূন্যতা ও বদলকে সঙ্গী করেই আজ তিনি জীবনের কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়েছেন। জুবিনের না থাকা সত্ত্বেও তাঁর রেখে যাওয়া স্মৃতি, গান এবং অনুরাগীদের অন্তহীন ভালোবাসাই আজ গরিমার বেঁচে থাকার একমাত্র সম্বল। তারকা খ্যাতির অনেক গভীরে লুকিয়ে থাকা এক সাধারণ প্রেমিকের গল্প এবং এক অদম্য শিল্পীর আত্মত্যাগের এই দলিল বাংলার আপামর সংগীতপ্রেমী মানুষকে আরও একবার গভীরভাবে নাড়িয়ে দিয়েছে।