সঙ্গীত জগতে নেমে এল গভীর শোক! প্রয়াত হলেন দক্ষিণ ভারতের কিংবদন্তি প্রবীণ গায়িকা যমুনা রানি

ভারতীয় সঙ্গীত জগতে নেমে এল এক অপূরণীয় ও গভীর শূন্যতা। ‘কুঙ্গুমাপুভে কোঞ্জুম পুরাভে’-এর মতো একাধিক কালজয়ী ও অবিস্মরণীয় গানের জন্য বিশ্বজুড়ে খ্যাত প্রবীণ প্লেব্যাক গায়িকা যমুনা রানি আর নেই। ৮৮ বছর বয়সে বার্ধক্যজনিত নানা অসুস্থতার সঙ্গে লড়াই করে বেঙ্গালুরুর নিজ বাসভবনেই তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। তামিল, তেলুগু, কন্নড় এবং মালয়ালম চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রির এক উজ্জ্বল নক্ষত্র ছিলেন তিনি। দীর্ঘ ও বর্ণাঢ্য কর্মজীবনে তিনি ৬, পিছিয়ে না থেকে হাজারেরও বেশি গান রেকর্ড করার এক অনন্য নজির গড়ে গেছেন। তাঁর এই বিশাল সঙ্গীত ঐতিহ্য আজও প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে নতুন শিল্পী ও সঙ্গীতপ্রেমীদের গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করে চলেছে।

মাত্র সাত বছর বয়সে তাঁর এই সুদীর্ঘ ও অসাধারণ সঙ্গীত যাত্রা শুরু হয়েছিল। ১৯৩৮ সালে অন্ধ্র প্রদেশে জন্মগ্রহণকারী যমুনা রানি শৈশবেই তেলুগু চলচ্চিত্র ‘ত্যাগাইয়া’-তে প্লেব্যাক গায়িকা হিসেবে পা রেখেছিলেন। পরবর্তীতে ১৯৫২ সালে ‘কল্যাণী’ ছবির মাধ্যমে তিনি তামিল চলচ্চিত্রে সফল অভিষেক করেন এবং মুহূর্তের মধ্যে দক্ষিণ ভারতীয় চলচ্চিত্রের অন্যতম জনপ্রিয় গায়িকা হিসেবে নিজের অবস্থান পাকাপোক্ত করে নেন। তাঁর অত্যন্ত স্বতন্ত্র ও জাদুকরী কণ্ঠ এবং শব্দের স্পষ্ট উচ্চারণ সঙ্গীতপ্রেমীদের হৃদয়ে তাঁর জন্য একটি বিশেষ স্থান তৈরি করে দিয়েছিল। তিনি বহু দশক ধরে বহু স্মরণীয় ও কালজয়ী গান উপহার দিয়েছেন, যার মধ্যে ‘সেন্থামিল থেন মোঝিয়াল’, ‘ইয়ারাদি নী মোহিনী’, ‘কুঙ্গুমাপুভে কোঞ্জুম পুরাভে’, ‘মামা মামা মামা’, ‘কালাই ভায়াসু কাট্টানা সাইজ’, ‘পাট্টোন্দ্রু কেত্তেন’, এবং এমনকি কমল হাসানের জনপ্রিয় ‘নায়কন’ ছবির ‘নান সিরিথাল দীপাবলি’ গানটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। আজও এই মনোরম গানগুলি শ্রোতাদের মনে এক বিশেষ নস্টালজিয়া তৈরি করে।

দক্ষিণ ভারতীয় চলচ্চিত্র জগতের সঙ্গীত ইতিহাসে তিনি রেখে গেছেন এক অবিস্মরণীয় অবদান। সেকালের শ্রেষ্ঠ সব সুরকার ও প্রথিতযশা চলচ্চিত্র নির্মাতাদের সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করে তিনি দক্ষিণ ভারতীয় চলচ্চিত্র সঙ্গীতের এক সোনালী অধ্যায় রচনা করেছিলেন। একাধিক ভাষা ও নানা বৈচিত্র্যময় ধারার সঙ্গীতে নিজের বহুমুখী প্রতিভার স্বাক্ষর রাখার জন্য তিনি বিশেষভাবে সমাদৃত ছিলেন। শিল্পকলায় তাঁর এই অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৯৮ সালে তামিলনাড়ু সরকার তাঁকে মর্যাদাপূর্ণ ‘কালাইমামানি পুরস্কার’ দিয়ে সম্মানিত করে। বর্ণাঢ্য এই কর্মজীবনে তিনি অত্যন্ত সম্মানজনক ‘আন্না পুরস্কার’-ও লাভ করেছিলেন। তাঁর কণ্ঠে জাদুকরী গানগুলি তামিল চলচ্চিত্রের ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। গত কয়েক বছর ধরে তিনি বেঙ্গালুরুতে তাঁর পরিবারের সঙ্গেই বসবাস করছিলেন। তাঁর প্রয়াণে চলচ্চিত্র জগৎ, বিশিষ্ট সংগীতশিল্পী এবং অগণিত ভক্তদের মধ্যে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। যমুনা রানি শারীরিকভবে আজ আর আমাদের মাঝে না থাকলেও, দক্ষিণ ভারতীয় চলচ্চিত্র ও সঙ্গীত জগতকে সমৃদ্ধ করা তাঁর হাজারও অমর গান চিরকাল বেঁচে থাকবে।