ঘুমের মধ্যে হঠাৎ হাত-পা ছোঁড়া বা শরীর কাঁপছে? জানুন মারণ রোগের ভয়ংকর লক্ষণ!

ঘুমের মধ্যে হঠাৎ শরীর কেঁপে ওঠা, হাত-পা ছুড়তে থাকা কিংবা অদ্ভুত শব্দ করে ওঠার মতো ঘটনাগুলোকে অনেকেই সাধারণ ঘুমের সমস্যা ভেবে এড়িয়ে যান। কিন্তু বারবার এমন লক্ষণ দেখা দিলে তা অত্যন্ত বিপজ্জনক হতে পারে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে ‘নক্টার্নাল সিজার’ বা ঘুমের মধ্যে খিঁচুনি বলা হয়। মৃগীরোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ঘুমের মধ্যেও এমন খিঁচুনি দেখা দিতে পারে। বিরল ও জটিল কিছু ক্ষেত্রে ঘুমের মধ্যে হওয়া এই খিঁচুনির কারণে শ্বাসপ্রশ্বাস ও হৃদস্পন্দনে বড় ধরনের জটিলতা তৈরি হতে পারে, যা অনেক সময় প্রাণঘাতী পর্যন্ত হয়ে দাঁড়ায়। তাই সঠিক সময়ে লক্ষণগুলো চিনে চিকিৎসা নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।

আমাদের মস্তিষ্কের অগণিত স্নায়ুকোষ বৈদ্যুতিক সংকেতের মাধ্যমে পরস্পরের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে। এই সংকেতগুলোই শরীরের পেশি, স্নায়ু ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের কার্যকারিতা নিয়ন্ত্রণ করে। কিন্তু কোনো কারণে মস্তিষ্কের এই বৈদ্যুতিক কার্যকলাপে অস্বাভাবিকতা দেখা দিলে খিঁচুনির সৃষ্টি হয়। এপিলেপসি বা মৃগীরোগ এ ধরনের খিঁচুনির অন্যতম প্রধান কারণ। যেহেতু ঘুমের সময়ও মস্তিষ্ক সচল থাকে, তাই মৃগীরোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ঘুমের ঘরেও খিঁচুনি হতে পারে। শিশু থেকে শুরু করে যেকোনো বয়সেই এই সমস্যা দেখা দিতে পারে।

কাদের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি? পরিবারে মৃগীরোগের কোনো ইতিহাস থাকলে কিংবা অতীতে নিজের খিঁচুনির রেকর্ড থাকলে এই ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। এ ছাড়া মস্তিষ্কে সংক্রমণ, মাথায় গুরুতর আঘাত, মস্তিষ্কের গঠনগত ত্রুটি এবং নির্দিষ্ট কিছু জিনগত কারণেও এমন সমস্যা হতে পারে। শিশুদের ক্ষেত্রে উচ্চ জ্বরের সঙ্গে খিঁচুনি দেখা দেওয়ার প্রবণতা থাকে। অন্যদিকে, রক্তে শর্করার মাত্রা অতিরিক্ত কমে গেলে কিংবা সোডিয়াম ও পটাশিয়ামের মতো প্রয়োজনীয় খনিজের ভারসাম্য নষ্ট হলেও খিঁচুনি হতে পারে। মস্তিষ্কে টিউমার বা অন্য কোনো জটিল সমস্যাও এর পেছনে থাকতে পারে। পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব, দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তি এবং মানসিক চাপ মৃগীরোগীদের খিঁচুনির প্রবণতা বাড়িয়ে দেয়। অতিরিক্ত মদ্যপান বা হঠাৎ মদ্যপান ছেড়ে দেওয়া এবং কিছু নির্দিষ্ট ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থেকেও এমন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কখনোই ওষুধের মাত্রা পরিবর্তন করা উচিত নয়।

ঘুমের মধ্যে খিঁচুনি চেনার উপায় ঘুমের মধ্যে খিঁচুনি হলে রোগীরা সাধারণত নিজেরা তা বুঝতে পারেন না। তবে পাশে থাকা পরিবারের সদস্যরা কয়েকটি স্পষ্ট লক্ষণ দেখে বিষয়টি আঁচ করতে পারেন। যেমন—ঘুমের মধ্যে হঠাৎ শরীর শক্ত হয়ে যাওয়া, হাত-পা অনিয়ন্ত্রিতভাবে কাঁপা বা ছুড়তে থাকা, মুখ দিয়ে অদ্ভুত শব্দ বের হওয়া, জিহ্বায় কামড়ের দাগ বসা এবং খিঁচুনির পর দীর্ঘ সময় ধরে বিভ্রান্ত থাকা। অনেক সময় শ্বাসপ্রশ্বাসে সমস্যা কিংবা ঠোঁট নীলচে হয়ে যাওয়ার মতো মারাত্মক লক্ষণও দেখা দিতে পারে। সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর সারা শরীরে তীব্র ব্যথা, মাথাব্যথা বা অস্বাভাবিক ক্লান্তি অনুভূত হতে পারে। তবে হিপনিক জার্ক, নাইট টেরর বা আরইএম স্লিপ বিহেভিয়ার ডিসঅর্ডারের মতো সমস্যাগুলোকেও অনেক সময় খিঁচুনি বলে ভুল হতে পারে। তাই কেবল শরীর কাঁপা দেখেই নিশ্চিত হওয়া যায় না, এর জন্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।

কেন এটি প্রাণঘাতী হতে পারে? খিঁচুনির সময় রোগীদের শ্বাসপ্রশ্বাসে মারাত্মক জটিলতা তৈরি হতে পারে। অত্যন্ত বিরল হলেও মৃগীরোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ঘুমের মধ্যে আকস্মিক অপ্রত্যাশিত মৃত্যু ঘটতে পারে, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে ‘সাডেন আনএক্সপেকটেড ডেথ ইন এপিলেপসি’ বা সুদেপ বলা হয়। রাতের বেলায় মস্তিষ্কে বৈদ্যুতিক তরঙ্গের চলাচল হঠাৎ স্তব্ধ হয়ে গেলে শরীরে প্রবল ঝাঁকুনি শুরু হয়। এই ঝাঁকুনি এতটাই মারাত্মক হতে পারে যে হৃদযন্ত্রের গতি থেমে যেতে পারে, হৃৎস্পন্দন অনিয়মিত হয়ে পড়তে পারে এবং শ্বাসপ্রশ্বাস সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যেতে পারে। মস্তিষ্কের কোষগুলোর ওপর অতিরিক্ত চাপের কারণে রোগী ঘুমের মধ্যেই হৃদরোগ বা ব্রেন স্ট্রোকে আক্রান্ত হতে পারেন।

প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও সতর্কতা বারবার এ ধরনের লক্ষণ প্রকাশ পেলে অবিলম্বে একজন স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত। চিকিৎসক প্রয়োজন অনুযায়ী ইইজি বা ইলেকট্রোএনসেফালোগ্রাম পরীক্ষার মাধ্যমে মস্তিষ্কের বৈদ্যুতিক কার্যকলাপ পরীক্ষা করেন। ঘুমের মধ্যে খিঁচুনি সন্দেহ হলে ভিডিও ইইজি করার প্রয়োজন হতে পারে। পাশাপাশি মস্তিষ্কের এমআরআই এবং রক্তে শর্করা ও খনিজের মাত্রা পরীক্ষা করা হয়। খিঁচুনি পাঁচ মিনিটের বেশি স্থায়ী হলে, পরপর বারবার হলে বা রোগী স্বাভাবিক চেতনায় ফিরে না এলে দ্রুত জরুরি চিকিৎসা নিতে হবে। খিঁচুনির সময় রোগীকে জাপ্টে ধরে চেপে রাখা বা মুখে চামচ বা পানি ঢোকানো থেকে বিরত থাকতে হবে। বরং আশপাশের শক্ত জিনিস সরিয়ে মাথার নিচে নরম কিছু দিন। খিঁচুনি থামার পর রোগীকে কাত করে শুইয়ে দিন। সঠিক সময়ে রোগ শনাক্ত ও চিকিৎসকের নির্দেশ মেনে চললে বড় বিপদের হাত থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব।