মানবদেহের ‘ষটচক্র’ ও ১৩টি চূড়ার অলৌকিক মন্দির! সংস্কারের অভাবে কেন ক্ষোভে ফুঁসছেন ভক্তরা?

মানবদেহের তান্ত্রিক ‘ষটচক্র’ প্রণালীতে নির্মিত বাঁশবেড়িয়ার ঐতিহাসিক ও ঐতিহ্যবাহী হংসেশ্বরী মন্দির। এর অনন্য স্থাপত্যশৈলী ও পাশেই অবস্থিত অসাধারণ টেরাকোটার অনন্ত বাসুদেব মন্দির দেখতে প্রতি বছর দেশ-বিদেশের হাজার হাজার পর্যটক ও পুণ্যার্থী ভিড় জমান। তবে বর্তমানে দুই শতাব্দীরও বেশি প্রাচীন এই মন্দিরকে কেন্দ্র করে একদিকে প্রশাসনিক চরম উদাসীনতা এবং অন্যদিকে ভারতীয় পুরাতত্ত্ব বিভাগের (ASI) কর্মীদের বিরুদ্ধে মারাত্মক সব অভিযোগে চরম শোরগোল ছড়িয়েছে।

মন্দিরের ভেতরে নেশাসেবনের বিস্ফোরক অভিযোগ: মন্দিরের সুরক্ষায় নিয়োজিত ভারতীয় পুরাতত্ত্ব বিভাগের (ASI) কর্মীদের বিরুদ্ধে ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটিয়েছেন মন্দিরের প্রধান পুরোহিত বসন্ত চট্টোপাধ্যায়। তাঁর বিস্ফোরক অভিযোগ, “করোনা-পর্বের পর থেকে এএসআই-এর তরফে মন্দিরের কোনো সংস্কার কাজ তো করা হয়ইনি, উল্টে এএসআই-এর কয়েকজন কর্মী মন্দিরের ভেতরের একটি ভূগর্ভস্থ (Underground) ঘর দখল করে সেখানে নিয়মিত নেশা সেবন করছেন!” ঐতিহ্যবাহী মন্দিরে কর্মীদের এই অনৈতিক কার্যকলাপের বিরুদ্ধে তাঁরা কড়া আইনি ও প্রশাসনিক পদক্ষেপের চিন্তাভাবনা করছেন বলে জানিয়েছেন।

এই বিষয়ে সপ্তগ্রামের বিজেপি বিধায়ক স্বরাজ ঘোষ জানান, পুরোহিত লিখিতভাবে অভিযোগ জানালে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অন্যদিকে, ভারতীয় পুরাতত্ত্ব বিভাগের পশ্চিমবঙ্গের আধিকারিক জানিয়েছেন, সংস্কারের জন্য এখনও কোনো নির্দেশিকা না আসলেও, কর্মচারীদের বিরুদ্ধে এমন গুরুতর অভিযোগ জমা পড়লে তা গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হবে।

ষটচক্র ও ১৩ চূড়ার অলৌকিক ইতিহাস: ১৭৯৯ সালে রাজা নৃসিংহ দেব রায়ের হাত ধরে এই মন্দিরের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়। পরে ১৮১৪ সালে তাঁর সহধর্মিণী রানি শঙ্করী দেবী এর নির্মাণকাজ সম্পন্ন করেন। মানবদেহের শক্তির ৬টি প্রধান কেন্দ্র বা ‘ষটচক্র’ তত্ত্বের ওপর ভিত্তি করে গঠিত এই মন্দিরের শীর্ষে রয়েছে শতদল পদ্মের ১৩টি চূড়া।

মন্দিরটির কেন্দ্রস্থল নির্মিত রাজস্থানের বিশেষ পাথরে, আর বাকি অংশ চুন-সুড়কি দিয়ে তৈরি। মহাকাল শিবের হৃদয়ের ওপর সহস্রদল পদ্মে চতুর্ভুজা মায়ের শান্ত নীল রূপ প্রতিষ্ঠিত। মায়ের চার হাতের এক হাতে খড়্গ, অন্য হাতে মুণ্ড এবং বাকি দু’টি হাত অভয় ও বরদা মুদ্রায় সজ্জিত।

কালীপুজোর রাতে ২১৩ বছরের গোপন ও অদ্ভুত প্রথা: এমনিতে মা হংসেশ্বরীকে শান্ত রূপে পুজো করা হলেও, কালীপুজোর রাতে বদলে যায় সমস্ত নিয়ম। পুরোহিত বসন্ত চট্টোপাধ্যায় জানিয়েছেন, গত ২১৩ বছর ধরে রাজপরিবারের নিয়ম মেনে কালীপুজোর রাতে মাকে সম্পূর্ণ ‘উগ্র রূপ’ ও ‘রাজবেশ’ পরানো হয়।

এই বিশেষ রাতে মায়ের পরনে কোনো বস্ত্র থাকে না; কেবল নানা ফুল ও মালায় দেবীকে সুসজ্জিত করা হয়। মুখে লাগানো হয় নিখাদ সোনার তৈরি জিভ এবং মাথায় পরানো হয় ভারী রুপোর মুকুট। এরপর ভোর চারটে বাজার সঙ্গে সঙ্গে সেই বিশেষ রাজবেশ খুলে মাকে পুনরায় স্বাভাবিক বস্ত্র পরানো হয়।

প্রাচীন ইতিহাস, অপরূপ স্থাপত্য এবং অলৌকিক এই পুজোকে ঘিরে বাঁশবেড়িয়ার মানুষের আবেগ যেমন জড়িয়ে রয়েছে, তেমনই পুরাতত্ত্ব বিভাগের অধীনে থাকা এই মন্দিরের দ্রুত সংস্কার ও পবিত্রতা বজায় রাখার জন্য এখন সরব হয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও পর্যটকরা।

Aditi Banik
  • Aditi Banik