যন্তর মন্তরে বিক্ষোভ নিয়ে তোলপাড়, বিরোধীদের কড়া বার্তা সুপ্রিম কোর্টের! ৫০ লাখ মানুষের ভোগান্তিতে সোচ্চার প্রধান বিচারপতি

গণতন্ত্রে আন্দোলন বা প্রতিবাদ করার অধিকার প্রতিটি নাগরিকের রয়েছে। কিন্তু সেই অধিকার প্রয়োগের নামে অন্য সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা এবং ব্যবসা-বাণিজ্য কি অনির্দিষ্টকালের জন্য স্তব্ধ করে দেওয়া যায়? দিল্লির যন্তর মন্তরে বিরোধীদের সাম্প্রতিক বিক্ষোভ ও নির্বাচন কমিশন বিরোধী আন্দোলনের আবহে উঠে আসা এই গুরুতর প্রশ্নটি নিয়ে এবার কড়া ও তাৎপর্যপূর্ণ পর্যবেক্ষণ দিল দেশের সর্বোচ্চ আদালত।
মঙ্গলবার এই সংক্রান্ত মামলার শুনানিতে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন, “কোনও একটি নির্দিষ্ট জায়গা অনির্দিষ্টকালের জন্য দখল করে রাখা সম্ভব নয়।” শীর্ষ আদালতের বক্তব্য, সংবিধান প্রতিবাদের অধিকার দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু একইসঙ্গে অন্যদেরও নিজেদের দাবি জানানোর এবং স্বাভাবিক জীবনযাপনের মৌলিক অধিকার সমানভাবে রয়েছে।
যন্তর মন্তরের বিক্ষোভ ও জনজীবনের অচলাবস্থা: গত মাসে দিল্লির যন্তর মন্তরে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে বিরোধী দল এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠনের তরফে বড়সড় প্রতিবাদ কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছিল। সেই আন্দোলনকে কেন্দ্র করে আশপাশের এলাকায় সৃষ্টি হয় চরম বিশৃঙ্খলা। নিরাপত্তার খাতিরে পুলিশের ব্যাপক ধরপাকড়, মেট্রো স্টেশন বন্ধ রাখা ও ইন্টারনেট পরিষেবা বিচ্ছিন্ন করার মতো পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়, যার জেরে নাভিশ্বাসে পড়ে সাধারণ মানুষ।
এই পরিস্থিতির জেরে দিল্লির ব্যবসায়ী সংগঠনগুলি সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়। ব্যবসায়ীদের পক্ষে সওয়ালকারী আইনজীবী আদালতে জানান, আন্দোলনস্থলের আশপাশে প্রায় ৫০ লক্ষ মানুষ বসবাস করেন। লাগাতার প্রতিবাদের কারণে দোকানপাট বন্ধ রয়েছে এবং দিল্লির অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক কেন্দ্র কনট প্লেস (Connaught Place) কার্যত জনশূন্য হয়ে পড়েছে। এর ফলে প্রতিদিন বিপুল আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা।
ভারসাম্য রক্ষায় প্রধান বিচারপতির বার্তা: শুনানিকালে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত ইঙ্গিত দেন, “একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী যদি দীর্ঘদিন কোনও স্থান দখল করে রাখে, তবে সেখানে কৃষক কিংবা আইনজীবী—যাঁরাই নিজেদের দাবি জানাতে আসবেন, তাঁদের অধিকারও বাধাপ্রাপ্ত হবে।” অর্থাৎ কোনও জায়গা একটি বিশেষ আন্দোলনের জন্য চিরকালের মতো আটকে রাখা যায় না।
এই পরিপ্রক্ষেতে সুপ্রিম কোর্ট নির্দেশ দিয়েছে যে, নির্বাচন কমিশন বিরোধী ওই প্রতিবাদের উদ্যোক্তাদেরও এই মামলায় অন্যতম পক্ষ (party) হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। আন্দোলনের ফলে সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীদের যে ক্ষতি হয়েছে, সে বিষয়ে উদ্যোক্তাদের জবাবদিহিতা চাওয়া অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করছে আদালত।
কেন্দ্রীয় সরকারের অবস্থান: সরকারের পক্ষে সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা আদালতে যুক্তি দেন, “কোনও ব্যক্তি বা সংগঠন প্রতিবাদের ডাক দিলে, সেই কর্মসূচির পরিণতির দায়ও তাদেরই নেওয়া উচিত।”
ভারতে শান্তিপূর্ণ আন্দোলন যেমন সংবিধান স্বীকৃত, তেমনই সাধারণ মানুষের অবাধ যাতায়াত এবং জীবিকা নির্বাহের অধিকারও সমান গুরুত্বপূর্ণ। দিল্লির মতো জনবহুল শহরে দীর্ঘমেয়াদী আন্দোলন সাধারণ মানুষের অধিকারকে কীভাবে খর্ব করছে, শীর্ষ আদালতের এদিনের পর্যবেক্ষণ নতুন করে সেই গণতান্ত্রিক ভারসাম্যের প্রশ্নটি সামনে নিয়ে এল। মামলার পরবর্তী শুনানিতে আয়োজক পক্ষ ও ব্যবসায়ীদের বক্তব্য শোনার পরেই আদালত পরবর্তী পদক্ষেপ জানাবে।