শুধু রামায়ণ নয়! কোন কোন ঐতিহাসিক ও পৌরাণিক ঘটনার সাক্ষী দীপাবলির এই মহা উৎসব?

অন্ধকারের উপর আলোর জয়, অশুভ শক্তির বিনাশ এবং নতুন আশার সূচনা—এই বার্তাই বহন করে দীপাবলি বা আলোর উৎসব। ভারতের অন্যতম বড় এই উৎসব ঘিরে প্রতি বছর মেতে ওঠেন দেশের কোটি কোটি মানুষ। বাড়ি সাজানো, প্রদীপ জ্বালানো, রংবেরঙের আলপনা, মিষ্টিমুখ এবং লক্ষ্মী-গণেশের পুজোয় উদযাপিত হয় দীপাবলি। তবে শুধু একটি পৌরাণিক কাহিনি নয়, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে নানা ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে এই উৎসবের তাৎপর্য।

২০২৬ সালে দীপাবলি পালিত হবে ৮ নভেম্বর, রবিবার। হিন্দু চান্দ্র পঞ্জিকার কার্তিক মাসের অমাবস্যা তিথিতে মূলত এই উৎসব উদযাপিত হয়। এই দিন সন্ধ্যায় দেবী লক্ষ্মী ও ভগবান গণেশের পুজো বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বাস করা হয়, নিষ্ঠার সঙ্গে পুজো এবং প্রদীপ জ্বালালে ঘরে সুখ, সমৃদ্ধি ও সৌভাগ্য আসে।

দীপাবলি ২০২৬: লক্ষ্মীপুজোর সময়সূচি
লক্ষ্মীপুজো: ৮ নভেম্বর, রবিবার

লক্ষ্মীপুজোর মুহূর্ত: বিকেল ৫টা ৫৪ মিনিট থেকে সন্ধ্যা ৭টা ৫০ মিনিট

পুজোর সময়কাল: ১ ঘণ্টা ৫৬ মিনিট

প্রদোষ কাল: বিকেল ৫টা ৩১ মিনিট থেকে রাত ৮টা ৯ মিনিট

বৃষভ কাল: বিকেল ৫টা ৫৪ মিনিট থেকে সন্ধ্যা ৭টা ৫০ মিনিট

অমাবস্যা তিথি শুরু: ৮ নভেম্বর সকাল ১১টা ২৭ মিনিট

অমাবস্যা তিথি শেষ: ৯ নভেম্বর দুপুর ১২টা ৩১ মিনিট

কেন পালিত হয় দীপাবলি? রয়েছে একাধিক পৌরাণিক কাহিনি
দীপাবলির মূল বার্তা হল অন্ধকারের উপর আলোর জয়, অজ্ঞতার উপর জ্ঞানের জয় এবং অশুভের উপর শুভ শক্তির প্রতিষ্ঠা। তবে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে এই উৎসব পালনের পিছনে রয়েছে আলাদা আলাদা ধর্মীয় বিশ্বাস ও কাহিনি।

রামের অযোধ্যায় প্রত্যাবর্তন: দীপাবলির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে রামায়ণের একটি জনপ্রিয় কাহিনি। হিন্দু বিশ্বাস অনুযায়ী, ১৪ বছরের বনবাস শেষ করে স্ত্রী সীতা এবং ভাই লক্ষ্মণকে সঙ্গে নিয়ে অযোধ্যায় ফিরে এসেছিলেন ভগবান রাম। লঙ্কার রাজা রাবণকে পরাজিত করে সীতাকে উদ্ধারের পর রাম, সীতা ও লক্ষ্মণের প্রত্যাবর্তন উপলক্ষে অযোধ্যার মানুষ গোটা নগরী প্রদীপের আলোয় সাজিয়ে তুলেছিলেন। সেই থেকেই দীপাবলিতে সারি সারি মাটির প্রদীপ জ্বালানোর প্রথা প্রচলিত হয়েছে।

নরকাসুর বধ ও কৃষ্ণের বিজয়: দক্ষিণ ও পশ্চিম ভারতের বেশ কিছু অঞ্চলে দীপাবলির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ভগবান কৃষ্ণের নরকাসুর বধের কাহিনি। অত্যাচারী শাসক নরকাসুর বহু নারীকে বন্দি করে রেখেছিল। কৃষ্ণ তাকে পরাজিত করে বন্দিদের মুক্ত করেন এবং শান্তি ফিরিয়ে আনেন। এই ঘটনাকে স্মরণ করা হয় নরক চতুর্দশীতে, যা ছোট দীপাবলি নামেও পরিচিত।

লক্ষ্মী-গণেশের পুজোর তাৎপর্য: দীপাবলির অন্যতম প্রধান আচার হল দেবী লক্ষ্মী এবং ভগবান গণেশের পুজো। দেবী লক্ষ্মীকে সম্পদ ও সৌভাগ্যের দেবী এবং ভগবান গণেশকে বিঘ্নহর্তা ও জ্ঞানের প্রতীক হিসেবে মানা হয়। দীপাবলির সন্ধ্যায় ঘর পরিষ্কার করে প্রদীপ জ্বালিয়ে লক্ষ্মী ও গণেশের পুজো করলে পরিবারে সুখ-সমৃদ্ধি আসে।

শিখ ও জৈন ধর্মেও দীপাবলির বিশেষ গুরুত্ব
দীপাবলি শুধু হিন্দু ধর্মের উৎসব নয়। শিখ ও জৈন সম্প্রদায়ের কাছেও এই দিনটির আলাদা ঐতিহাসিক ও আধ্যাত্মিক তাৎপর্য রয়েছে।

শিখ ধর্মে বন্দি ছোড় দিবস: দীপাবলির দিন শিখ সম্প্রদায়ের মানুষ বন্দি ছোড় দিবস পালন করেন। এই দিনটি ষষ্ঠ শিখ গুরু গুরু হরগোবিন্দ সাহিবজির গ্বালিয়র দুর্গ থেকে মুক্তির স্মৃতির সঙ্গে যুক্ত। শিখ ঐতিহ্য অনুযায়ী, তাঁর সঙ্গে ৫২ জন হিন্দু রাজাও মুক্তি পেয়েছিলেন।

জৈন ধর্মে মহাবীরের নির্বাণ: জৈন সম্প্রদায়ের কাছে দীপাবলি হল ২৪তম তীর্থঙ্কর ভগবান মহাবীরের নির্বাণলাভের স্মরণদিবস। বর্তমান বিহারের পাপাপুরীতে তিনি মোক্ষ লাভ করেছিলেন। তাঁর অহিংসা, সত্য ও আধ্যাত্মিক মুক্তির শিক্ষাকে স্মরণ করেন ভক্তরা।

দীপাবলি শব্দের অর্থ ও উদযাপনের বৈচিত্র্য
‘দীপাবলি’ শব্দটি এসেছে সংস্কৃত ‘দীপাবলী’ থেকে, যার অর্থ প্রদীপের সারি। পাঁচ দিন ধরে চলা এই উৎসবের পর্বগুলো হলো ধনতেরস, নরক চতুর্দশী, দীপাবলি, গোবর্ধন পুজো এবং ভাইফোঁটা। ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে এর রূপও আলাদা—উত্তর ভারতে রামের অযোধ্যা প্রত্যাবর্তন, দক্ষিণ ভারতে নরকাসুর বধ, পশ্চিম ভারতে নতুন হিসাবের খাতা পুজো এবং পূর্ব ভারতে কালীপুজো বিশেষ গুরুত্ব পায়। প্রদীপ জ্বালানো কেবল একটি প্রথা নয়, এটি মানুষের জীবন থেকে অজ্ঞতা ও নেতিবাচকতা দূর করে জ্ঞান ও আশার পথে এগিয়ে যাওয়ার গভীর প্রতীক।