উন্নয়নের বুলডোজারে ধ্বংস হচ্ছে সহ্যাদ্রির জঙ্গল! মুম্বইয়ের কাছে এক ধাক্কায় কাটা পড়ল ১১০০ গাছ!

পাহাড়ের বুকে কাটা গাছের গুঁড়িতে এখনও নম্বরগুলো স্পষ্ট চক দিয়ে লেখা। মুম্বই (Mumbai) থেকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার দূরে সায়ডোঙ্গার পাহাড়ে (Saidongar hill) আপাতত বন্ধ রয়েছে গাছ কাটার কাজ। কিন্তু তার আগেই কাটা পড়েছে প্রায় ১,১০০টি মূল্যবান বৃক্ষ। ৩,০০০ মেগাওয়াটের পাম্পড-স্টোরেজ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য রায়গড় জেলার কারজতে শুরু হয়েছিল এই বিপুল বৃক্ষচ্ছেদন। যার প্রতিবাদে কেবল পরিবেশবিদ বা বিরোধীরাই সরব হননি, রুজি-রুটি ও অস্তিত্ব হারানোর শঙ্কায় দিন গুনছেন স্থানীয় প্রায় ১৫০টি জনজাতি পরিবার।

টরেন্ট পাওয়ার (Torrent Power) সংস্থায় ১৩,৫০৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ২০২৯ সালের মধ্যে এই প্রকল্প চালু করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। এর জন্য সহ্যাদ্রি পর্বতমালা সংলগ্ন অঞ্চলের ৩৭৭ হেক্টর জমি এবং ৩২,০০০-এরও বেশি গাছ কাটা প্রয়োজন। তবে বিরোধীদের প্রতিবাদ ও গ্রামবাসীদের অসন্তোষের মুখে আপাতত সাময়িকভাবে গাছ কাটা বন্ধ রেখেছে বন দফতর। বনকর্মীরা এখন পাহাড়ে পাহাড়ে পাহারা দিচ্ছেন, যাতে স্থানীয় গ্রামবাসীরা সেখান থেকে জ্বালানি কাঠ সংগ্রহ করতে না পারেন।

আদিবাসী জীবন ও ‘স্বভাবজ ফার্মেসি’
সায়ডোঙ্গার পাহাড়ের খাঁজে গড়ে উঠেছে পালিবাসী-সহ ছয়টি ছোট জনপদ। যেখানে মূলত ‘কাটকারী’ উপজাতির মানুষের বাস। প্রথা অনুযায়ী বছরের পর বছর ধরে বনের কাঠ বিক্রি করে দিনপ্রতি ১৫০ থেকে ২০০ টাকা রোজগার করতেন তাঁরা। বন থেকে মধু, মহুয়া, জাম এবং পেয়ারা সংগ্রহ করে চলত তাঁদের সংসার। শুধু রুজি-রোটিই নয়, তাঁদের কাছে এই জঙ্গলই হল চিকিৎসালয়। নিম, গিলয় কিংবা বাসকের মতো ভেষজ উদ্ভিদই ছিল তাঁদের একমাত্র ওষুধ। করোনা অতিমারীর কঠিন সময়েও এই বনের ভেষজ পানীয় ব্যবহার করে সুস্থ ছিলেন বলে জানিয়েছেন প্রবীণ জনজাতি নেতা নানা বারকু। ফলে জঙ্গল ধ্বংস হলে তাঁদের চিরাচরিত জীবনযাত্রাই পুরোপুরি মুছে যাবে বলে আশঙ্কা স্থানীয়দের।

বঞ্চিত ফরেস্ট রাইটস অ্যাক্ট (২০০৬) থেকে
অরণ্য অধিকার আইন বা ফরেস্ট রাইটস অ্যাক্ট (২০০৬)-এর আওতায় কোনও প্রকল্পে বনভূমি হস্তান্তরের আগে সেখানকার অধিবাসীদের প্রথাগত অধিকার সুনিশ্চিত করা এবং গ্রামসভার মাধ্যমে পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণের প্রস্তাব পাঠানো বাধ্যতামূলক। কিন্তু বন দফতরের দাবি, পালি গ্রামসভা থেকে কোনও নির্দিষ্ট তথ্য বা আবেদন জমা না পড়ায় পরিবেশ মন্ত্রক থেকে পুনর্বাসন ছাড়াই প্রকল্পটির চূড়ান্ত ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে। ফলে পুরুষানুক্রমে বসবাস করেও এক ছটাক জমি বা সরকারি ক্ষতিপূরণের অধিকার থেকে বঞ্চিত হতে বসেছেন এই আদিবাসীরা।

হুমকির মুখে বিরল বন্যপ্রাণী ও দূরবর্তী বৃষ্টিপাত
২০১১ সালে পরিবেশবিদ মাধব গ্যাডগিল কমিটি সহ্যাদ্রি অঞ্চলকে অতি সংবেদনশীল অঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত করে ভারী অবকাঠামো তৈরিতে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার সুপারিশ করেছিল, যা শেষ পর্যন্ত কার্যকর হয়নি। প্রকল্পটির সমীক্ষা অঞ্চলে চিতাবাঘ, ভালুক, ময়ূর, অজগর-সহ বন্যপ্রাণ সুরক্ষা আইনের ২৬টি বিপন্ন ও সংরক্ষিত প্রজাতির উপস্থিতি নথিভুক্ত রয়েছে। পাশাপাশি, বৃক্ষচ্ছেদনের প্রভাব কেবল স্থানীয় পরিবেশেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। আইআইটি বোম্বে ও সিএসআইআর-এর গবেষণায় দেখা গিয়েছে, সহ্যাদ্রির এই ঘন বনভূমির বাষ্পীভবন তামিলনাড়ু ও কাবেরী অববাহিকার বৃষ্টিপাতের অন্যতম উৎস। গবেষকদের মতে, এই পরিসরে জঙ্গল উচ্ছেদ হলে সুদূর তামিলনাড়ুর তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ার পাশাপাশি বর্ষার প্রাকৃতিক চক্রেও বড়সড় পরিবর্তন আসতে পারে।

উন্নয়ন বনাম বিকল্প সওয়াল
মহারাষ্ট্রের বিদ্যুৎ চাহিদার বড় অংশ মেটানো হয় কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে। উপমুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্ৰ ফড়ণবীশ ও প্রকল্প কর্তৃপক্ষের দাবি, তাপবিদ্যুতের ওপর নির্ভরতা কমাতে এবং পরিবেশবান্ধব শক্তির সঞ্চয় নিশ্চিত করতে এই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র অত্যন্ত জরুরি। সৌর বা বায়ুশক্তি থেকে পাওয়া উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ ব্যবহার করে পাহাড়ের নীচের জলাধার থেকে ওপরে জল পাম্প করে রাখা হবে, যা সন্ধ্যায় বিদ্যুতের চাহিদা তুঙ্গে উঠলে টারবাইন ঘুরিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনে সাহায্য করবে। সংস্থার তরফে জানানো হয়েছে, এই প্রকল্পের বিনিময়ে সাঁতারা জেলায় ২৫৩ হেক্টর জমিতে ক্ষতিপূরণমূলক সামাজিক বনসৃজন করা হচ্ছে। সেখানে প্রায় ১ লক্ষ গাছ লাগানোর পরিকল্পনা রয়েছে। এ ছাড়া জনজাতিদের জন্য ৫০ শয্যার একটি বিশেষ হাসপাতাল, নৈশ আলোকসজ্জা ও কাজের সুযোগ তৈরির প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে টরেন্ট পাওয়ার। তবে কাগজ-কলমে উন্নয়নের এই খতিয়ান সত্ত্বেও, কাটার চিহ্নে চিহ্নিত সায়ডোঙ্গার পাহাড়ের ওপর দাঁড়িয়ে জনজাতিদের একটাই প্রশ্ন— যে বন তাঁদের বাঁচিয়ে রেখেছে, তা হারিয়ে গেলে নতুন হাসপাতাল কিংবা বিদ্যুৎ প্রকল্প কীসের হিতে লাগবে?