ককপিটে রক্তস্নাত লড়াই! মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও কীভাবে শত শত প্রাণ বাঁচালেন ভারতীয় পাইলট?

ককপিটে এক রক্তক্ষয়ী ও জরুরি পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েও অসামান্য সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন ভারতীয় পাইলট ক্যাপ্টেন স্মিত মচ্ছার। চরম গুরুতর ও রক্তাক্ত অবস্থাতেও বিন্দুমাত্র হার না মেনে তিনি নিজের শারীরিক যন্ত্রণাকে উপেক্ষা করে ককপিটের দরজা খুলে দিয়েছিলেন। তাঁর এই বুদ্ধিমত্তা ও সময়োপযোগী সিদ্ধান্তের ফলেই বিমানকর্মী এবং যাত্রীরা দ্রুত পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার সুযোগ পান এবং একটি সম্ভাব্য ভয়াবহ বিমান দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পায় শত শত প্রাণ। বিপদের মুহূর্তে প্রদর্শিত এই অনন্য সাহসিকতার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি স্বরূপ তাঁকে বিশেষ সম্মান জানাল সংযুক্ত আরব আমিরশাহি (ইউএই)। ক্যাপ্টেন স্মিতের পাশাপাশি ফ্লাইদুবাই (Flydubai) বিমান সংস্থার সংশ্লিষ্ট কর্মীরাও এই prestigious সম্মান লাভ করেছেন।
গত ৩০ সেপ্টেম্বরের সেই রোমহর্ষক ঘটনার পর থেকেই ক্যাপ্টেন স্মিতের সাহসিকতা বিশ্বজুড়ে ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছে। এবার তাঁকে এবং বিমানের অন্য সাহসী কর্মীদের সর্বোচ্চ সম্মান জানালেন সংযুক্ত আরব আমিরশাহির প্রেসিডেন্ট শেখ মহম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান। সংকটজনক পরিস্থিতিতে যাত্রীদের নিরাপত্তা শতভাগ নিশ্চিত করতে তাঁদের পেশাদারিত্ব, অসামান্য দায়িত্ববোধ ও সাহসিকতার স্বীকৃতি হিসেবে তাঁদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে মর্যাদাপূর্ণ ‘ফার্স্ট ক্লাস অর্ডার অফ জায়েদ দ্বিতীয়’ সম্মান।
দুবাইয়ের যুবরাজ শেখ হামদান বিন মহম্মদ বিন রশিদ আল মাকতুমের হাত দিয়ে এই সম্মান তুলে দেওয়া হয়। উল্লেখ্য, তিনি একই সঙ্গে সংযুক্ত আরব আমিরশাহির উপপ্রধানমন্ত্রী, প্রতিরক্ষামন্ত্রী এবং দুবাইয়ের এক্সিকিউটিভ কাউন্সিলের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছেন। গত মঙ্গলবার প্রেসিডেন্ট শেখ মহম্মদ বিন জায়েদ এবং দুবাইয়ের শাসক তথা সংযুক্ত আরব আমিরশাহির উপপ্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী শেখ মহম্মদ বিন রশিদ আল মাকতুমের মহামান্য উপস্থিতিতে এই বিমানকর্মীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন শীর্ষ নেতৃত্ব।
বিপদের মুহূর্তে তাঁদের অদম্য দায়িত্ববোধ ও মানুষের অমূল্য জীবন রক্ষার প্রচেষ্টার ভূয়সী প্রশংসা করে সে দেশের নেতৃত্ব। সাধারণ মানুষের সুরক্ষা এবং জীবন বাঁচানো যে সংযুক্ত আরব আমিরশাহির প্রশাসনিক ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার, সেই শক্ত বার্তাও জোরালোভাবে দেওয়া হয়। দেশের শীর্ষ নেতৃত্ব থেকে এমন সম্মান পেয়ে অত্যন্ত আবেগপ্রবণ ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন বিমানকর্মীরা। তাঁদের মতে, এই বিশ্বমানের স্বীকৃতি তাঁদের কর্মজীবনের সবচেয়ে বড় গর্বের বিষয়।
এর আগে গত ৩ অক্টোবর আহত অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ক্যাপ্টেন স্মিত মচ্ছারকে দেখতে হাসপাতালে ছুটে গিয়েছিলেন যুবরাজ শেখ হামদান। হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে থাকা বীর পাইলটের সঙ্গে সরাসরি দেখা করে তাঁর সাহসিকতা, দায়িত্ববোধ এবং মানবজীবনের প্রতি অকুণ্ঠ দায়বদ্ধতার প্রশংসা করেন তিনি। পরবর্তীতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি বিশেষ পোস্টে শেখ হামদান লেখেন, দেশের সর্বোচ্চ নেতৃত্বের পক্ষ থেকে ক্যাপ্টেন স্মিতের জন্য রয়েছে অন্তহীন সম্মান ও অকৃত্রিম প্রশংসা। পাশাপাশি, সংযুক্ত আরব আমিরশাহির অসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষও এই রোমহর্ষক ঘটনায় ক্যাপ্টেন স্মিত, বিমানের কেবিন ক্রু এবং তাৎক্ষণিকভাবে পরিস্থিতি সামাল দিতে এগিয়ে আসা সাহায্যকারী যাত্রীদের ভূয়সী প্রশংসা করেছিল।
ক্যাপ্টেন স্মিতের এই ঐতিহাসিক সাহসিকতার অকুন্ঠ প্রশংসা করেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু এবং আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। গুরুতর আহত ও রক্তাক্ত অবস্থাতেও নিজের জীবনের পরোয়া না করে ককপিটের দরজা খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্তকে বর্তমান যুগের অন্যতম সাহসিকতার অনন্য নজির হিসেবে তুলে ধরেছেন বিশ্বনেতারা। শুধু তাই নয়, ইজরায়েলের সরকারের পক্ষ থেকেও ক্যাপ্টেন স্মিতকে বেসামরিক সাহসিকতার জন্য বিশেষ সম্মান জানানোর কথা ঘোষণা করা হয়েছে। শারীরিক আঘাত থেকে সম্পূর্ণ সেরে ওঠার পর আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁকে এই সম্মান প্রদান করা হবে। বিমানকর্মী ও সাধারণ যাত্রীদের সম্মিলিত সদিচ্ছা এবং ত্বরিত প্রচেষ্টায় সম্ভাব্য বড় বিপদ এড়ানোর এই ঘটনা আজ বিশ্বজুড়ে অদম্য মানবিকতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে।