পুজোর মরশুমে ডেঙ্গির লাল চোখ! ২৩ দিনে সাড়ে ৫ হাজার আক্রান্ত হতেই নবান্নে জরুরি বৈঠক

রাজ্যজুড়ে উৎসবের মরশুম ও শারদোৎসবের আনন্দ যখন তুঙ্গে, ঠিক সেই সময়ই চোখ রাঙাতে শুরু করেছে মশাবাহিত রোগ ডেঙ্গি। অক্টোবর মাসের প্রথম ২৩ দিনেই রাজ্যে ডেঙ্গি আক্রান্তের সংখ্যা সাড়ে পাঁচ হাজার ছাড়িয়ে যাওয়ায় স্বাস্থ্য মহলে তীব্র চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। পরিসংখ্যান বলছে, গত সেপ্টেম্বর মাসে যেখানে মোট আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ৩ হাজার ১৭২, সেখানে চলতি মাসের মাত্র তিন সপ্তাহে এই সংখ্যা একলাফে দ্বিগুণ কাছাকাছি পৌঁছে যাওয়ায় সংক্রমণের ঊর্ধ্বমুখী গ্রাফ এখন যথেষ্ট উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্বাস্থ্য দপ্তরের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে রাজ্যের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ২৯৯ জন ডেঙ্গি রোগী। সব মিলিয়ে চলতি বছরে এখনও পর্যন্ত রাজ্যে মোট ডেঙ্গি আক্রান্তের সংখ্যা সাড়ে বারো হাজারের গণ্ডি পার করে ফেলেছে। স্বাস্থ্য দপ্তরের প্রকাশিত তালিকা অনুযায়ী, আক্রান্তের নিরিখে বর্তমানে ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখে দাঁড়িয়ে রয়েছে মুর্শিদাবাদ, হাওড়া, কলকাতা এবং উত্তর ২৪ পরগনা জেলা।

বিশেষ করে শিল্প শহর হাওড়ায় ডেঙ্গির প্রকোপ যেভাবে নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে, তাতে স্থানীয় প্রশাসন ও সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বাড়ছে। হাওড়া পৌরসভা এলাকায় নতুন করে ৪৭ জন ডেঙ্গি রোগীর সন্ধান মিলেছে। শুধু তাই নয়, গত ১৪ অক্টোবর থেকে ২০ অক্টোবর—এই এক সপ্তাহের মধ্যে কেবল ডোমজুড় এলাকাতেই ২৭ জন নতুন করে ডেঙ্গিতে আক্রান্ত হয়েছেন। গত বছর পুরো হাওড়া জেলায় মোট ডেঙ্গি আক্রান্তের সংখ্যা যেখানে ছিল ৬৪৭ জন, সেখানে চলতি বছরের এই অল্প সময়ের মধ্যেই আক্রান্তের সংখ্যা পৌঁছে গিয়েছে ৬২৩-এ। এর মধ্যে একা হাওড়া শহর এলাকাতেই আক্রান্ত হয়েছেন ৩৫০ জন। একদিকে যখন আক্রান্তের সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে, ঠিক তখন রাজ্যবাসীর একাংশের মধ্যে ভীতি থাকলেও, স্বাস্থ্যমন্ত্রী শুক্রবার এক বিশেষ বিবৃতিতে দাবি করেছেন যে গত বছরের তুলনামূলক পরিসংখ্যান বিচার করলে এবছরের ডেঙ্গি পরিস্থিতি এখনও পর্যন্ত প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

তবে ডেঙ্গির এই বাড়বাড়ন্তের পেছনে হাসপাতাল চত্বর ও তার আশপাশের অপরিচ্ছন্ন পরিবেশকে অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। হাসপাতাল চত্বরের যত্রতত্র জমে থাকা জঞ্জাল ও ময়লার স্তূপ দ্রুত সাফাই করতে এবার সরাসরি পুর ও নগরোন্নয়ন দফতরকে কড়া চিঠি পাঠিয়েছেন রাজ্যের স্বাস্থ্যসচিব। ওই চিঠিতে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, হাসপাতালের মতো সংবেদনশীল চত্বর সর্বদা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার মূল দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট পুর ও নগরোন্নয়ন দফতরের। হাসপাতালের ময়লা সময়মতো পরিষ্কার না হলে সেখানে মশার লার্ভা জন্ম নিতে পারে এবং তা থেকে রোগ আরও দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

এই আবর্জনা ও পরিচ্ছন্নতা সংক্রান্ত সমস্যার জেরে শুক্রবার রাজ্যের সমস্ত সরকারি হাসপাতালের সুপার ও আধিকারিকদের নিয়ে একটি জরুরি উচ্চপর্যায় বৈঠক করেছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। এর আগে পুরুলিয়ার দেবেন মাহাতো সদর হাসপাতালের চত্বরে জমে থাকা ময়লার স্তূপ ও বেহাল দশা দেখে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন স্থানীয় বিজেপি সাংসদ জ্যোতির্ময় সিং মাহাতো। অভিযোগ উঠেছিল, খোদ হাসপাতাল চত্বর থেকেই স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বত মুখোপাধ্যায়কে সরাসরি ফোন করে চরম অসন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন ওই সাংসদ। বিজেপি সাংসদের সেই টেলিফোনিক ক্ষোভের পরই নড়েচড়ে বসে স্বাস্থ্য ভবন। পরিস্থিতি কতটা গুরুতর হতে পারে তা অনুধাবন করেই অবিলম্বে হাসপাতালগুলির পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখতে তড়িঘড়ি এই উচ্চপর্যায়ের জরুরি বৈঠক আহ্বান করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। উৎসবে মেতে ওঠার আগে প্রশাসনের এই কঠোর পদক্ষেপ ডেঙ্গি পরিস্থিতি কতটা নিয়ন্ত্রণে আনতে পারে, এখন সেটাই দেখার বিষয়।