পুজোর কদিনেই রেকর্ড ভাঙল শিয়ালদহ! আকাশছোঁয়া ভিড় সামলে কী করল রেল?

২০২৬ সালের দুর্গাপুজোয় শিয়ালদহ ডিভিশনে যাত্রী পরিবহনের ক্ষেত্রে এক ঐতিহাসিক রেকর্ড সৃষ্টি হয়েছে। পূর্ব রেলের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ষষ্ঠী থেকে দশমী পর্যন্ত এই পাঁচদিনের উৎসবে শহরতলির ট্রেনে যাতায়াত করেছেন ২ কোটি ৬৩ লক্ষেরও বেশি মানুষ। গত বছরের তুলনায় এ বছর যাত্রীসংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় ৩৩.৪৪ শতাংশ, যা রেলওয়ের ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। বিপুল এই জনস্রোত ও উৎসবের অতিরিক্ত চাপ সাফল্যের সঙ্গে মোকাবিলা করতে এবং পরিষেবা সম্পূর্ণ স্বাভাবিক রাখতে এবার বিশেষ ও কার্যকর একাধিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিল শিয়ালদহ ডিভিশন।
কলকাতা ও তার পার্শ্ববর্তী শহরতলির প্রতিটি মণ্ডপে প্যান্ডেল হপিং এবং ঠাকুর দেখার আনন্দ উপভোগ করতে দুর্গাপুজোর দিনগুলিতে লক্ষ লক্ষ মানুষ রাস্তায় নেমে পড়েন। দৈনন্দিন যাতায়াতের এই পর্বে শহরতলির লোকাল ট্রেনই সাধারণ মানুষের প্রধান ও নির্ভরযোগ্য ভরসা। এ বছরের পুজোতেও তার কোনো ব্যতিক্রম দেখা যায়নি, বরং আগের বছরের তুলনায় যাত্রীসংখ্যার দিক থেকে এক অভাবনীয় উল্লম্ফন লক্ষ্য করা গেছে। রেলের তথ্য ভাণ্ডার থেকে জানা যায়, চলতি বছরের ষষ্ঠী থেকে দশমী—এই পাঁচ দিনের পুজো পরিক্রমায় মোট ২৬৬টি বিশেষ বা স্পেশাল ট্রেন চালানো হয়েছে। এর ফলে সাধারণ পুজোমুখো যাত্রীদের উপচে পড়া ভিড় যেমন সফলভাবে সামাল দেওয়া সম্ভব হয়েছে, তেমনই প্রতিটি যাত্রীর গন্তব্যে নির্বিঘ্নে ও সময়মতো পৌঁছানোর জন্য অতিরিক্ত পরিবহনের এক শক্তিশালী পরিকাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব হয়েছিল।
তবে যাত্রীসংখ্যা এই বিশাল পরিমাণে বৃদ্ধির নেপথ্যে আরও একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও কারিগরি কারণ লুকিয়ে রয়েছে। চলতি বছরের দুর্গাপুজোর হিসাবের সামগ্রিক সময়সীমা গত বছরের তুলনায় ঠিক এক দিন বেশি ছিল। বিশেষ করে এ বছরের ক্যালেন্ডার অনুযায়ী সপ্তমী তিথিও এই যাত্রী গণনার পরিসরের অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। স্বাভাবিকভাবেই অতিরিক্ত আরও একটি দিনের দীর্ঘ সময় ধরে চলা যাত্রী চলাচল মোট সংখ্যার পরিসংখ্যানকে অনেকটাই বাড়িয়ে দিয়েছে এবং সামগ্রিক হিসাবে তার স্পষ্ট প্রভাব পড়েছে।
উৎসবের এই দিনগুলিতে শিয়ালদহ মূল স্টেশন ছাড়াও দমদম, বিধাননগর রোড, সোনারপুর, বালিগঞ্জ, রানাঘাট এবং কল্যাণী জংশন স্টেশনগুলিতে বিশেষভাবে রেকর্ড পরিমাণ যাত্রীসমাগম লক্ষ্য করা গিয়েছিল। এই অত্যন্ত ব্যস্ত স্টেশনগুলিতে যাত্রীদের নিরাপদ যাতায়াত এবং চলাচল পুরোপুরি নির্বিঘ্ন রাখতে বিশেষ নজরদারি এবং কঠোর ভিড় নিয়ন্ত্রণের সুব্যবস্থা করা হয়েছিল। বিশেষ করে কল্যাণী স্টেশনে যাত্রীসংখ্যা অন্যান্য বছরের তুলনায় প্রায় ১৪.০১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা আলাদাভাবে নজর কেড়েছে।
উৎসবের মরসুমে এই বিপুল সংখ্যক যাত্রীর নিরাপদ যাতায়াত সুষ্ঠু ও সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালনা করতে শিয়ালদহ ডিভিশনের প্রতিটি সংশ্লিষ্ট বিভাগ অত্যন্ত নিবিড় সমন্বয়ের ভিত্তিতে একযোগে কাজ করেছে। কমার্শিয়াল বিভাগ, অপারেটিং বিভাগ, রেলওয়ে প্রোটেকশন ফোর্স বা আরপিএফ (RPF) এবং মেডিক্যাল টিম সহ সমস্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত বিভাগগুলি পারস্পরিক সহযোগিতায় পরিস্থিতি অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে নিয়ন্ত্রণ করেছে। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্টেশনে রেলকর্মী এবং সিভিল ভলান্টিয়ারদের সুনির্দিষ্টভাবে মোতায়েন করা হয়েছিল। যাত্রীদের সঠিক দিকনির্দেশনা প্রদান, জনাকীর্ণ প্ল্যাটফর্মে ভিড় নিয়ন্ত্রণ এবং প্রয়োজনীয় জরুরি সহায়তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি পাবলিক অ্যাড্রেস সিস্টেম ও মেগাফোনের মাধ্যমে নিরন্তর সতর্কতামূলক ও তথ্যমূলক ঘোষণা করা হয়েছে। তাছাড়া, ডিভিশনাল ওয়ার রুম থেকে পুরো পরিস্থিতির ওপর অত্যন্ত ধারাবাহিক ও তীক্ষ্ণ নজরদারি চালানো হয়েছে যাতে কোথাও কোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি না হয়।
শিয়ালদহের ডিআরএম রাজীব সাক্সেনা এই প্রসঙ্গে সন্তোষ প্রকাশ করে জানিয়েছেন যে, দুর্গাপুজোর এই বিশাল সংখ্যক যাত্রীর নিরাপদ চলাচল অত্যন্ত সফলভাবে পরিচালনা করতে সক্ষম হয়েছে শিয়ালদহ ডিভিশন। নির্ধারিত সময়ে বিশেষ ট্রেন চালানো থেকে শুরু করে অত্যন্ত কার্যকর ভিড় নিয়ন্ত্রণ—প্রতিটি পদক্ষেপেই রেলকর্মীদের সম্মিলিত ও অক্লান্ত প্রচেষ্টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে বলে তিনি বিশেষভাবে উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে তিনি সকল যাত্রীর অসামান্য সহযোগিতা, অফুরন্ত ধৈর্য এবং পারস্পরিক বোঝাপড়ার জন্য গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। তাঁর মতে, এই বিরাট সাফল্য সম্পূর্ণভাবে রেল পরিবারের সম্মিলিত কর্মপ্রয়াসের এক উজ্জ্বল প্রতিফলন। প্রতিটি সাধারণ যাত্রীর জন্য সর্বদা নিরাপদ, সুবিধাজনক এবং সম্পূর্ণ নির্ভরযোগ্য পরিষেবা নিশ্চিত করাই আমাদের মূল ও একমাত্র লক্ষ্য। সব মিলিয়ে, পুজোর কটি দিনে ২.৬৩ কোটিরও বেশি যাত্রীর নিরাপদ যাতায়াত এবং গত বছরের তুলনায় ৩৩.৪৪ শতাংশ যাত্রীসংখ্যা বৃদ্ধি শিয়ালদহ ডিভিশনের কাছে এ বছরের দুর্গাপুজোকে এক বিশাল অপারেশনাল ও পরিষেবামূলক সফল পরীক্ষায় পরিণত করেছে।