দিল্লির বুকে যুগান্তকার বদল! ৩৩ বছর পর পাকাপাকিভাবে বন্ধ যন্তর মন্তর, কোথায় হবে এবার আন্দোলন?

দিল্লির বুকে প্রতিবাদের ঠিকানা বারবার বদলেছে। একসময় ইন্ডিয়া গেটের কাছে বোট ক্লাবের মাঠে জমায়েত হত লক্ষ লক্ষ মানুষের। সংসদ ভবন ও কেন্দ্রীয় সরকারের দফতরের কাছেই চলত বিক্ষোভ, সভা, মিছিল। কিন্তু ১৯৮৮ সালে কৃষক নেতা মহেন্দ্র সিং টিকায়েতের নেতৃত্বে বিশাল কৃষক আন্দোলন এবং ১৯৯২ সালে বাবরি মসজিদ ধ্বংসের পর তৈরি হওয়া নিরাপত্তা উদ্বেগ সেই ছবিটা পুরোপুরি বদলে দেয়। ১৯৯৩ সাল থেকে ধীরে ধীরে দিল্লির প্রতিবাদের প্রধান ঠিকানা হয়ে ওঠে যন্তর মন্তর।
এবার প্রায় ৩৩ বছর পর ফের বদলে গেল রাজধানীর প্রতিবাদের মানচিত্র। নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকারের আমলে যন্তর মন্তরকে বিক্ষোভের নির্দিষ্ট জায়গার তালিকা থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বাদ দিয়েছে দিল্লি পুলিশ। তার বদলে রামলীলা ময়দান, বুরারি ময়দান এবং পূর্ব দিল্লির সিবিডি ময়দানকে নতুন প্রতিবাদস্থল হিসেবে চিহ্নিত করেছে অমিত শাহের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক। ফলে প্রশ্ন উঠছে, কেন বারবার বদলাতে হয়েছে দিল্লিতে প্রতিবাদের ঠিকানা? এর পিছনে রয়েছে কৃষক আন্দোলন থেকে শুরু করে বাবরি মসজিদ বিতর্ক, নিরাপত্তার উদ্বেগ এবং প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের দীর্ঘ ইতিহাস।
স্বাধীনতার পর দীর্ঘদিন দিল্লির বোট ক্লাবের মাঠ ছিল দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবাদস্থল। বিশাল খোলা জায়গায় একসঙ্গে প্রচুর মানুষের জমায়েত সম্ভব ছিল। কিন্তু ১৯৮৮ সালের অক্টোবরে ভারতীয় কিষান ইউনিয়নের নেতা মহেন্দ্র সিং টিকায়েতের নেতৃত্বে দিল্লিতে জড়ো হন প্রায় পাঁচ লক্ষ কৃষক। ট্রাক্টর, গরুর গাড়ি এবং রান্নার সমস্ত সরঞ্জাম নিয়ে কৃষকেরা বোট ক্লাবের মাঠেই অস্থায়ী শিবির গড়ে তোলেন। সরকারের ক্ষমতার কেন্দ্রের এত কাছে এত বড় জমায়েত সামলানো প্রশাসনের পক্ষে কঠিন হয়ে পড়ে এবং দিল্লির তীব্র যান চলাচল ব্যাহত হয়।
এর পরেই রাম জন্মভূমি-বাবরি মসজিদ আন্দোলন এবং ১৯৯২ সালের ডিসেম্বরে বাবরি মসজিদ ধ্বংসের পর দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। ১৯৯৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী পি ভি নরসিংহ রাওয়ের নেতৃত্বাধীন কংগ্রেস সরকার বোট ক্লাবে বড় জমায়েত বন্ধ করার পথে হাঁটে। প্রতিবাদকারীদের আটকাতে রাস্তায় নামানো হয়েছিল এক লক্ষেরও বেশি সেনা, পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনীর সদস্যদের।
এর পরেই বিকল্প প্রতিবাদস্থল হিসেবে গুরুত্ব বাড়ে যন্তর মন্তরের। বোট ক্লাবের তুলনায় যন্তর মন্তরের রাস্তা ছিল অনেকটাই সরু এবং প্রবেশ ও বেরোনোর পথ সীমিত। ফলে সেখানে জমায়েতের উপর নজর রাখা এবং ভিড় নিয়ন্ত্রণ করা প্রশাসনের পক্ষে তুলনায় সহজ ছিল। একই সঙ্গে সংসদ ভবন ও কেন্দ্রীয় সরকারের দফতরগুলির কাছাকাছি থাকায় প্রতিবাদকারীরাও নিজেদের দাবি ক্ষমতাসীনদের নজরে আনতে পারতেন। তবে রামলীলা ময়দান বা বুরারি ময়দানের মতো নতুন এবং আধুনিক স্থানে প্রতিবাদের ঠিকানা স্থানান্তরিত হওয়ায় এখন রাজধানীর আন্দোলনের চরিত্র এক নতুন মোড় নিতে চলেছে।