ফিরছে অর্কুট? নতুন সোশ্যাল নেটওয়ার্ক তৈরির ডাক দিলেন প্রতিষ্ঠাতা বুয়ুকোকতেন

ফেসবুক বা ইনস্টাগ্রাম আসার অনেক আগে ইন্টারনেটের দুনিয়ায় ভার্চুয়াল বন্ধুত্বের আসল স্বাদ দিয়েছিল যে প্ল্যাটফর্ম, তার নাম ‘অর্কুট’ (Orkut)। বিশেষ করে জেন জি-র আগের প্রজন্মের কাছে এই প্ল্যাটফর্মটি ছিল প্রথম কোনো সোশ্যাল নেটওয়ার্কিংয়ের অভিজ্ঞতা। আজকের মতো রিলস, লাইক, ভিউ বা অ্যালগরিদমের দাপাদাপি তখন ছিল না। সাইবার ক্যাফেতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে স্ক্র্যাপবুক লেখা, বন্ধুদের প্রোফাইলে ‘টেস্টিমোনিয়াল’ দেওয়া কিংবা প্রিয় ব্যান্ডের কমিউনিটিতে যুক্ত হওয়ার সেই আবেগ আজও হাজারো মানুষের মনে অমলিন। আর এবার সেই নস্টালজিয়াকেই ফেরানোর ইঙ্গিত মিলল এক দশকেরও বেশি সময় পর।
গুগল ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে এই জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্মটি চিরতরে বন্ধ করে দিলেও, এর প্রতিষ্ঠাতা অর্কুট বুয়ুকোকতেন এবার এটিকে এক নতুন ও আধুনিক অবতারে ফিরিয়ে আনতে উদ্যোগী হয়েছেন। নতুন একটি সোশ্যাল নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার পরিকল্পনা নিয়ে তিনি বর্তমানে বিশ্বজুড়ে ব্যবহারকারীদের সমর্থন চেয়েছেন। তাঁর এই উদ্যোগে ইতিমধ্যেই অভূতপূর্ব সাড়া মিলেছে।
অর্কুটকে ফেরাতে তুঙ্গে সমর্থন অভিযান
অর্কুট বুয়ুকোকতেন সম্প্রতি এক্স (প্রাক্তন টুইটার) হ্যান্ডেলে একটি পোস্ট করে ব্যবহারকারীদের কাছে এই নতুন যাত্রার জন্য সমর্থন চেয়েছেন। তাঁর সাফ কথা, ইন্টারনেটের মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত মানুষকে নিজের পছন্দের মানুষের কাছাকাছি নিয়ে আসা। বন্ধুত্ব, কমিউনিটি এবং নিজের একটি নিরাপদ জায়গা খুঁজে পাওয়ার অনুভূতিই হওয়া উচিত সোশ্যাল মিডিয়ার প্রাণকেন্দ্র।
প্রতিষ্ঠাতার নিজস্ব ওয়েবসাইটে একটি খোলা চিঠি প্রকাশের পর ৯ অক্টোবর পর্যন্ত বিশ্বের ১১৫টি দেশের ২ লক্ষ ৭০ হাজারেরও বেশি মানুষ এই উদ্যোগে সমর্থন জানিয়েছেন। তবে পুরোনো অর্কুট ঠিক আগের রূপেই হুবহু ফিরে আসছে কি না বা নতুন প্ল্যাটফর্মটি কবে নাগাদ আত্মপ্রকাশ করবে, সে বিষয়ে এখনও নিশ্চিত কোনো ঘোষণা করা হয়নি।
বর্তমান সোশ্যাল মিডিয়া নিয়ে চরম ক্ষোভ
আজকের যুগের সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলি যেভাবে মানুষের মানসিকতাকে নিয়ন্ত্রণ করছে, তা নিয়ে তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন অর্কুট। তাঁর মতে, গত দুই দশকে এই মাধ্যমগুলির মূল চরিত্রই বদলে গেছে। অর্থপূর্ণ সম্পর্ক বা যোগাযোগ তৈরি করার বদলে এখনকার অ্যাপগুলির একমাত্র লক্ষ্য হলো ব্যবহারকারীদের স্ক্রিনের সামনে দীর্ঘক্ষণ আটকে রাখা।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, অ্যালগরিদমের ফাঁদে ফেলে একটি প্রজন্মের শিশুদের এমনভাবে নির্ভরশীল করে তোলা হয়েছে, যা তাদের পরষ্পরের থেকে বিচ্ছিন্ন করছে এবং কর্পোরেট বিজ্ঞাপনদাতাদের হাতে পণ্যে পরিণত করছে। এমনকি বর্তমান যুগের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), বট, ডিপফেক এবং এআই-নির্মিত কনটেন্টের রমরমা নিয়েও সতর্ক করেছেন তিনি। তাঁর মতে, এই প্রযুক্তির কারণে ইন্টারনেটে অন্য প্রান্তে থাকা মানুষটি আদৌ রক্ত-মাংসের মানুষ কি না, তা বোঝা দায় হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা পারস্পরিক বিশ্বাসকে চিরতরে নষ্ট করছে।
অর্কুটের সোনালী অতীত
২০০৪ সালের জানুয়ারিতে গুগলের ইঞ্জিনিয়ার অর্কুট বুয়ুকোকতেনের হাত ধরেই এই সোশ্যাল নেটওয়ার্কের যাত্রা শুরু হয়েছিল। একসময় ভারত এবং ব্রাজিলের তরুণ প্রজন্মের মধ্যে এটি ঝড় তুলেছিল। কিন্তু পরবর্তীতে ফেসবুকসহ অন্যান্য নিত্যনতুন প্ল্যাটফর্মের ভিড়ে জনপ্রিয়তা হারাতে শুরু করায় গুগল এটি বন্ধ করে দেয়। এর আগেও ২০২২ সালে তিনি অনুরূপ উদ্যোগের কথা জানিয়েছিলেন, যদিও তা সফল হয়নি। বর্তমানের এই নতুন প্রচেষ্টা সমর্থন সংগ্রহের প্রাথমিক পর্যায়ে থাকলেও, পুরনো দিনের সেই সরল ও খাঁটি বন্ধুত্বের দিনগুলি কি তবে সত্যিই ফিরতে চলেছে? উত্তর মিলবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গেই।