মুঘল সম্রাট আকবরের জমিদারি কি আজও রয়েছে? কোটি কোটি বিঘার সেই রাজত্ব এখন কার দখলে?

মুঘল সাম্রাজ্যের ইতিহাস রাজাদের ঐশ্বর্য, জাঁকজমক এবং বিলাসিতার গল্পে ভরপুর। যখন তৃতীয় মুঘল সম্রাট জালালউদ্দিন মুহাম্মদ আকবরের কথা আসে, তখন তাঁর বিশাল সাম্রাজ্য বিস্তার এবং শক্তির কথাই সবার আগে মনে পড়ে। কিন্তু কখনো কি মনে প্রশ্ন জেগেছে, যিনি সমগ্র ভারত শাসন করতেন, সেই সম্রাট আকবরের কত বিঘা জমি ছিল? আর শত শত বছর পর আজ সেই ঐতিহাসিক জমিগুলোর প্রকৃত মালিক কে?
ঐতিহাসিক নথি ও তথ্য অনুযায়ী, আকবরের শাসনামলে মুঘল সাম্রাজ্য প্রায় ৩০ থেকে ৩২ লক্ষ বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত ছিল। এর মধ্যে বর্তমান উত্তর ও মধ্য ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ এবং আফগানিস্তানের একটি বিশাল অংশ অন্তর্ভুক্ত ছিল। যদি এই পুরো এলাকাটিকে ভারতীয় ভূমি পরিমাপের প্রচলিত একক ‘বিঘা’-তে রূপান্তর করা হয়, তবে আকবরের সাম্রাজ্যের মোট আয়তন দাঁড়ায় প্রায় ৮০ থেকে ৯০ কোটি বিঘা। তবে এই সমস্ত জমি চাষাবাদের উপযোগী ছিল না। এর মধ্যে ছিল বিস্তীর্ণ অরণ্য, দুর্গম পর্বতমালা, নদী এবং ঊষর মরুভূমি অঞ্চল।
মুঘল আমলের প্রশাসনিক নিয়ম অনুযায়ী, সমস্ত জমি মূলত দুটি প্রধান ভাগে বিভক্ত ছিল। প্রথমটি হলো ‘খালিসা’ জমি, যা সরাসরি সম্রাট আকবরের ব্যক্তিগত সম্পত্তি হিসেবে গণ্য হতো। এই জমি থেকে সংগৃহীত সমস্ত রাজস্ব সরাসরি রাজকোষে জমা পড়ত। দ্বিতীয়টি হলো ‘জায়গির’ জমি, যা আকবর তাঁর বিশ্বস্ত সেনাপতি, মন্ত্রী এবং নবরত্নদের বেতনের বিকল্প হিসেবে প্রদান করতেন। আকবরের ব্যক্তিগত খালিসা জমি কোটি কোটি বিঘা জুড়ে বিস্তৃত ছিল, যা সমগ্র রাজপ্রাসাদ এবং সেনাবাহিনীর বিশাল ব্যয়ভার বহন করতে সাহায্য করত।
জমি পরিমাপের ক্ষেত্রে আকবরের একটি ঐতিহাসিক অবদান আজও দৃশ্যমান। বর্তমান ভারতের অনেক রাজ্যে জমি মাপার জন্য যে ‘বিঘা’ পদ্ধতি ব্যবহৃত হয়, তার আধুনিক রূপ আকবরের আমলেই নির্ধারিত হয়েছিল। আকবরের অর্থমন্ত্রী রাজা টোডরমল জমি নিখুঁতভাবে মাপার জন্য বিশেষ লোহার আংটি লাগানো বাঁশের দড়ি তৈরি করিয়েছিলেন এবং ৩৬০০ ইলাহি গজকে এক বিঘা হিসেবে নির্ধারণ করেছিলেন। সে যুগে এক বিঘা আজকের দিনের প্রায় আধ একরের সমান ছিল।
মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের পর ইতিহাসের চাকা ঘুরেছে এবং দেশের ভূমি ব্যবস্থাতেও এসেছে বিশাল পরিবর্তন। আজ আকবরের সেই লক্ষ লক্ষ একর জমি আর কোনো একক ব্যক্তি বা রাজপরিবারের মালিকানাধীন নেই। মুঘল ও ব্রিটিশ শাসনের পর ভারতের স্বাধীনতার সময় এবং পরবর্তীকালে সরকার ঐতিহাসিক ভূমি সংস্কার আইন বাস্তবায়ন করে। এই আইনগুলোর মাধ্যমে যে কৃষকরা বংশপরম্পরায় জমিতে কঠোর পরিশ্রম করে আসছিলেন, মূলত তাঁদের হাতেই জমির প্রকৃত মালিকানা তুলে দেওয়া হয়।
আজ উত্তরপ্রদেশ, পাঞ্জাব, হরিয়ানা, বিহার এবং মধ্যপ্রদেশের লক্ষ লক্ষ সাধারণ কৃষক সেই সমস্ত উর্বর জমিতে চাষাবাদ করেন, যা একসময় মুঘল সম্রাট আকবরের সাম্রাজ্যের অংশ ছিল। অন্যদিকে, আকবর কর্তৃক নির্মিত ঐতিহাসিক দুর্গসমূহ—যেমন আগ্রার দুর্গ, ফতেপুর সিক্রি এবং এলাহাবাদ দুর্গ—এবং সেগুলোকে ঘিরে থাকা হাজার হাজার বিঘা জমি বর্তমানে ভারতের প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ বিভাগ (এএসআই)-এর সরাসরি নিয়ন্ত্রণে সংরক্ষিত রয়েছে।