ঢাকার দেড়শো বছরের ঐতিহ্য! শিলিগুড়ির চক্রবর্তী বাড়িতে কীভাবে হয় সাবেকি দুর্গাপুজো?

শহরজুড়ে পুজোর প্রস্তুতি এখন তুঙ্গে। কোথাও মণ্ডপ তৈরির কাজ শেষ পর্যায়ে, কোথাও চলছে আলোকসজ্জার প্রস্তুতি, আবার কোথাও নতুন পোশাক আর ঠাকুর দেখার পরিকল্পনা। তবে শিলিগুড়ির দেশবন্ধুপাড়ার চক্রবর্তী বাড়িতে পুজোর প্রস্তুতি মানেই শুধু পরিবারের ব্যস্ততা নয়। সন্ধ্যা হলেই সেখানে জড়ো হচ্ছেন পাড়ার মহিলারা। কারও হাতে গানের খাতা, কেউ আবার শুরু করে দিচ্ছেন আগমনী গানের সুর। দীর্ঘদিনের এই সম্পর্ক এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে তাঁরা এখন আর প্রতিবেশী নন, পরিবারেরই অংশ। পুজোর চারদিনের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেও তাঁদের সক্রিয় অংশগ্রহণ থাকে। ফলে এই বাড়ির পুজো তাঁদের কাছে বাইরের কোনও উৎসব নয়, নিজেদের ঘরের উৎসব।
চক্রবর্তী পরিবারের এই পুজোর শিকড় অবশ্য উত্তরবঙ্গে নয়, বহু দূরের বিক্রমপুরে। প্রায় দেড়শো বছর আগে বাংলাদেশের ঢাকায় এই পুজোর সূচনা হয়েছিল। সেই সময়কার পুজোর সঙ্গে জড়িয়ে ছিল মোষ বলির মতো প্রাচীন রীতিও। সময়ের প্রবাহে সেই প্রথা আর নেই। নানা কারণে একটা সময় পুজোর ধারাবাহিকতাতেও ছেদ পড়েছিল। পরে প্রায় ১৫ বছর আগে শিলিগুড়িতে নতুন করে শুরু হয় দেবীর আরাধনা। বর্তমানে রামকৃষ্ণ মিশনের বিধি মেনেই পুজো সম্পন্ন হয়। তবে ঐতিহ্যের নিজস্ব কিছু বৈশিষ্ট্য এখনও অটুট। পুজোর জন্য সাতটি নদী থেকে জল সংগ্রহ করে আনা হয়। দশকর্মার সামগ্রীও বাজারের নির্দিষ্ট দোকান থেকে কিনে আনার পরিবর্তে পরিবারের সদস্যরাই নিজেদের মতো করে সংগ্রহ করেন।
এই পুজোর প্রস্তুতির বড় অংশটাই সামلান পরিবারের গৃহকর্ত্রী শ্রাবণী চক্রবর্তী। প্রতিমার আরাধনা থেকে ভোগের আয়োজন, বাড়ির অনুষ্ঠান থেকে অতিথি আপ্যায়নের প্রস্তুতি—সবকিছুর মধ্যেই তাঁর সক্রিয় উপস্থিতি। দেবী দুর্গাকে তিনি পরিবারের মেয়ের মতোই দেখেন। সেই আবেগ থেকেই পুজোর বিশেষ একটি রীতিতে নিজের হাতে দেবীর গায়ে হলুদ লাগান তিনি। পুজোর ভোগেও থাকে তাঁর বিশেষ ভূমিকা। প্রায় ৫০ ধরনের পদ রান্নার আয়োজন হয়, যার বড় অংশ নিজের হাতেই তৈরি করেন শ্রাবণী। পঞ্চমী থেকে পরিবারের খাবারে থাকে নিরামিষের নিয়ম, আর দশমীতে ফিরে আসে আমিষের আয়োজন।
শ্রাবণী চক্রবর্তীর মতে, এই পুজোর আসল শক্তি হল সবাইকে সঙ্গে নিয়ে উৎসব করা। শুধু পরিবারের লোকজন নয়, বছরের পর বছর ধরে পাড়ার বাসিন্দারাও পুজোর বিভিন্ন কাজে নিজেদের যুক্ত করেছেন। কেউ রান্নাঘরে সাহায্য করেন, কেউ অতিথিদের দেখাশোনা করেন, আবার কেউ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের দায়িত্ব নেন। পুজোর দিন পরিবারের সদস্য ও প্রতিবেশীরা একসঙ্গে বসে খাওয়াদাওয়াও করেন। অন্যদিকে, বাড়িতে আসা অতিথি এবং দর্শনার্থীদের দেখভালের দায়িত্ব সামলান গৃহকর্তা দীপজ্যোতি চক্রবর্তী। তাঁর কথায়, এই পুজো দেখতে প্রতি বছর শহরের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ আসেন। ফলে পুজোর ব্যস্ততার মধ্যেও অতিথিদের যাতে কোনও সমস্যা না হয়, সেদিকটা সামলানো তাঁর অন্যতম দায়িত্ব।
এবারও চক্রবর্তী বাড়ির পুজোয় থাকছে ঐতিহ্যের সঙ্গে সংস্কৃতির মেলবন্ধন। শিলিগুড়ির শিল্পী সুশান্ত পালের তৈরি ডাকের সাজের প্রতিমায় হবে দেবীর আরাধনা। সন্ধ্যার পর বাড়ির পরিবেশ জমে উঠবে আগমনী গান, ধুনুচি নাচ এবং নানা সাংস্কৃতিক আয়োজনে। এই পুজোর অতিথিদের তালিকাতেও রয়েছে বিশেষ আকর্ষণ। শাশ্বত চট্টোপাধ্যায়, সব্যসাচী চক্রবর্তী-সহ চলচ্চিত্র জগতের একাধিক পরিচিত মুখ বিভিন্ন সময়ে এই পুজোয় উপস্থিত হন। তবে চক্রবর্তী বাড়ির দরজা পেরোলেই তাঁদের তারকা পরিচয় যেন পিছনে পড়ে যায়। পাড়ার মানুষ ও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে একসঙ্গে উৎসবে মেতে ওঠেন তাঁরাও। দেড়শো বছরের ঐতিহ্য, পারিবারিক আবেগ এবং প্রতিবেশীদের নিখাদ ভালোবাসাই চক্রবর্তী বাড়ির দুর্গাপুজোকে অনন্য করে তুলেছে।