“হিন্দুধর্ম অন্তর্ভুক্তিমূলক, আব্রাহামিক ধর্মগুলো বর্জনমূলক!” এফসিআরএ মামলার শুনানিতে মাদ্রাজ হাইকোর্টের বিস্ফোরক মন্তব্য

ধর্মীয় পরিচয় গোপন রাখা এবং বিদেশি অনুদান নিয়ন্ত্রণ আইনের (FCRA) সঠিক নির্দেশিকা না মানার অভিযোগে কোডাইকানালভিত্তিক ‘কানজিওন পাবলিক চ্যারিটেবল ট্রাস্ট’-এর এফসিআরএ নিবন্ধনের আবেদন খারিজ করে দিল মাদ্রাজ হাইকোর্ট। পাশাপাশি, এই মামলার শুনানিকালে আদালত ধর্ম, ধর্মান্তর এবং ভারতের বহুত্ববাদী সংস্কৃতি নিয়ে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও দূরদর্শী কিছু পর্যবেক্ষণ পেশ করেছে।
বিচারপতি জি.আর. স্বামীনাথন এবং এম.ডি. সুমথির ডিভিশন বেঞ্চ জানিয়েছে, ওই ট্রাস্টটি একটি জেন ধ্যান কেন্দ্র পরিচালনা করলেও এবং একজন খ্রিস্টান ধর্মযাজক (রেভারেন্ড ফাদার আমা সামি এসজে) দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হলেও, তাদের আবেদনে প্রকৃত ধর্মীয় চরিত্র স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়নি। ট্রাস্টটি নিজেদের জেন বৌদ্ধ দর্শনের অনুসারী হিসেবে পরিচয় দিলেও এফসিআরএ আইনের নিয়ম অনুযায়ী নিজেদের একটি পূর্ণাঙ্গ ধর্মীয় সংস্থা হিসেবে নথিভুক্ত করতে ব্যর্থ হয়।
আব্রাহামিক ধর্ম বনাম হিন্দুধর্ম নিয়ে পর্যবেক্ষণ শুনানির সময় আদালত হিন্দুধর্ম এবং আব্রাহামিক ধর্মগুলোর মূল প্রকৃতির ফারাক বোঝাতে গিয়ে মন্তব্য করে যে, হিন্দুধর্ম সহজাতভাবেই সকলের জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক, যেখানে আব্রাহামিক ধর্মগুলো স্বভাবগতভাবেই কিছুটা বর্জনমূলক প্রকৃতির হয়ে থাকে। আদালত পরিষ্কার ভাষায় জানিয়ে দেয়, এফসিআরএ আইনের ১২(৪)(এ)(আইআই) ধারাটি, যা ধর্মীয় ধর্মান্তরকে নিয়ন্ত্রণ করে, তা সব ধর্মের ক্ষেত্রেই সমানভাবে প্রযোজ্য। বিধিনিষেধহীনভাবে ধর্মান্তরের জন্য বিদেশি তহবিল বা অনুদান আসার অনুমতি দেওয়া হলে তা দেশের সার্বভৌমত্বের পক্ষে বড় বিপদ ডেকে আনতে পারে।
“আমরা মেল্টিং পট নই, সালাদ বোল” রায়ে আদালত আরও উল্লেখ করে যে, অতীতে কিছু উগ্রপন্থী সংগঠন বিভিন্ন উপায়ে ধর্মান্তরের মতো কার্যকলাপে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগের মুখে পড়েছে। তবে তাৎপর্যপূর্ণভাবে আদালত এও স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, বর্তমান মামলার আবেদনকারী ট্রাস্টকে সরাসরি এমন কোনো ধর্মান্তরের এজেন্ডা অনুসরণের জন্য অভিযুক্ত করা হচ্ছে না। কেরালা সহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যকার সাম্প্রতিক উত্তেজনার প্রসঙ্গ টেনে আদালত দেশের অভ্যন্তরীণ ভারসাম্য বজায় রাখার ওপর বিশেষ জোর দেয়।
বিচারপতি রুমা পালের একটি জনপ্রিয় উপমার উল্লেখ করে আদালত জানায়, “আমরা একটি চরম বৈচিত্র্যময় দেশ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো আমরা তথাকথিত ‘মেল্টিং পট’ বা গলন্ত পাত্র নই, বরং আমরা একটি ‘সালাদ বোল’, যেখানে প্রত্যেকেই তার নিজ নিজ স্বতন্ত্র পরিচয় বজায় রেখে একসঙ্গে অবস্থান করে। যদি এর মধ্যে কোনো একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় গোষ্ঠী অতিরিক্ত প্রভাবশালী বা একাধিপত্য বিস্তার করতে শুরু করে, তবে দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতির অবনতি ঘটতে বাধ্য।”
বিদেশি অর্থায়ন এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলির স্বচ্ছতা সংক্রান্ত এই রায়কে দেশের আইনি ও রাজনৈতিক মহলে অত্যন্ত দূরদর্শী পদক্ষেপ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।