পুকুরের শ্যাওলা থেকে চিকিৎসা বিজ্ঞানে নোবেল! জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকের হাত ধরেই কি বদলে গেল ব্রেন রিসার্চের ভবিষ্যৎ?

এ বছরের চিকিৎসাবিজ্ঞানের নোবেল পুরস্কারের সঙ্গে সরাসরি জুড়ে রয়েছে দিল্লির জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয় (JNU)-এর নাম। পুকুরের সাধারণ এককোষী সবুজ শ্যাওলা থেকে শুরু হওয়া এক গবেষণাই আজ চিকিৎসাবিজ্ঞান ও স্নায়ুতন্ত্রের গবেষণায় খুলে দিয়েছে এক নতুন দিগন্ত। ২০০০ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত জার্মানিতে নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী পিটার হেগেমানের গবেষণাগারে কাজ করেছিলেন জেএনইউ-র বর্তমান অধ্যাপক সুনীল কাটেরিয়া। তাঁর সেই আমলের গবেষণাই পরবর্তীতে মস্তিষ্কের কোষকে আলো দিয়ে নিয়ন্ত্রণের যুগান্তকারী প্রযুক্তি বা ‘অপ্টোজেনেটিকস’-এর ভিত্তি তৈরি করেছিল।
এ বছরের শারীরবিদ্যা ও চিকিৎসাবিজ্ঞানে যৌথভাবে নোবেল পেয়েছেন কার্ল ডেইসেরথ, পিটার হেগেমান এবং জর্জ নাগেল। আলো-নিয়ন্ত্রিত আয়ন চ্যানেল এবং অপ্টোজেনেটিকস নিয়ে তাঁদের যুগান্তকারী কাজ বিজ্ঞানীদের নির্দিষ্ট স্নায়ুকোষকে আলো ব্যবহার করে সক্রিয় বা নিষ্ক্রিয় করার সুযোগ করে দিয়েছে। এর ফলে মস্তিষ্ক কীভাবে কাজ করে, স্মৃতি বা আচরণের মতো জটিল বিষয়গুলির রহস্য উদ্ঘাটনে নতুন পথ খুলে গেছে। এই পুরো গবেষণার মূল উৎস ছিল একেবারে সাধারণ জলের শ্যাওলা। জলে থাকা এই ক্ষুদ্র জীব কীভাবে আলো চিনে তার দিকে এগিয়ে যায়, সেই রহস্যের সন্ধানেই কাজ শুরু করেছিলেন হেগেমানের দল, যেখানে মুখ্য ভূমিকা পালন করেছিলেন তরুণ ভারতীয় গবেষক সুনীল কাটেরিয়া।
গবেষণার সময় শ্যাওলার বংশগত উপাদান পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করে দুটি অজানা জিন শনাক্ত করেছিলেন কাটেরিয়া। এই জিনগুলি এমন আলোকসংবেদী প্রোটিন তৈরি করতে সাহায্য করে, যা আলো পেলেই কোষের বৈদ্যুতিক কার্যকলাপে আমূল পরিবর্তন ঘটায়। ২০০২ এবং ২০০৩ সালে প্রকাশিত গবেষণাপত্রে এই আবিষ্কারের যুগান্তকারী সাফল্য সামনে আসে। পরবর্তীকালে প্রমাণিত হয় যে, এই প্রোটিনগুলি ক্ষুদ্র দরজার মতো কাজ করে। নির্দিষ্ট আলো পড়লেই দরজা খুলে যায় এবং কোষের ভিতর বৈদ্যুতিক সংকেত তৈরি হয়, যা থেকে জন্ম নেয় অপ্টোজেনেটিকস।
নোবেল ঘোষণার পর নিজের অবদান নিয়ে অতিরিক্ত কৃতিত্ব নিতে নারাজ অধ্যাপক কাটেরিয়া। তাঁর মতে, কোনো বড় বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারই একক ব্যক্তির সাফল্য নয়। মৌলিক বিজ্ঞানের ওপর জোর দিলে সেখান থেকেই তৈরি হয় নতুন উদ্ভাবনের রাস্তা। কানপুর বিশ্ববিদ্যালয় ও বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার পর জেএনইউ, জার্মানি এবং আমেরিকার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজ করার সমৃদ্ধ অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর। বর্তমানে জেএনইউ-এর জীবপ্রতযুক্তি বিভাগে নিজের গবেষণাগার পরিচালনা করছেন তিনি। আলোকসংবেদী নতুন প্রোটিন ও শৈবাল-ভিত্তিক জৈবপ্রযুক্তি নিয়ে তাঁর এই নিরলস কাজ দেশের বিজ্ঞানমহলকে গর্বিত করেছে।