১৯০৯ সালের ঐতিহ্য আর একচালা প্রতিমার টানে আজও ফেরে পুরনো শিলিগুড়ি! শতাব্দী প্রাচীন পুজোর অন্দরে কোন কোন চমক?

শিলিগুড়ির দুর্গাপুজোর দীর্ঘ ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে শহরের বেড়ে ওঠার রোমাঞ্চকর গল্প। সেই বর্ণময় ইতিহাসের অন্যতম উজ্জ্বল নাম শিলিগুড়ির ‘মিত্র সম্মিলনী’। ১৯۰৯ সালে ক্লাব প্রতিষ্ঠার পর ১৯২৭ সাল থেকে শুরু হয় এই ঐতিহ্যবাহী দুর্গাপুজো। জমি দানের মূল শর্তই ছিল এই প্রাঙ্গণে নিয়মিত দুর্গাপুজো ও সরস্বতী পুজো করতে হবে, আর সেই পবিত্র অঙ্গীকারকে বুকে ধারণ করেই প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এগিয়ে চলেছে এই পুজো। দেখতে দেখতে এবার শতবর্ষের দোরগোড়ায় এসে পৌঁছেছে মিত্র সম্মিলনীর এই দুর্গোৎসব।
শতবর্ষের এই বিশেষ ও ঐতিহাসিক বছরে থিমের আধুনিক চাকচিক্য বা জৌলুস থেকে দূরে সরে পুজো কমিটি বরং ইতিহাসের সোনালী পাতায় ফিরে তাকাতে চাইছে। একসময় পুজোর দিনগুলিতে দূরদূরান্ত থেকে রাজা-জমিদারেরা ঘোড়ার গাড়ি কিংবা গরুর গাড়িতে চেপে এই পুজো দেখতে আসতেন। পুজোমণ্ডপ চত্বর ঘিরে বসত জমজমাট আড্ডা, সঙ্গে থাকত ঐতিহ্যবাহী নাটক ও যাত্রাপালার আয়োজন। তৎকালীন সেই বর্ণময় সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আবহকেই এবার মণ্ডপের অন্দরে নতুন করে দর্শকদের সামনে তুলে ধরার অনন্য উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এই ঐতিহাসিক গল্পের অন্যতম প্রধান চরিত্র হিসেবে থাকছে পুরনো শিলিগুড়ির নস্টালজিক ‘টয় ট্রেন’। একসময় মিত্র সম্মিলনীর ক্লাবের ঠিক সামনে দিয়েই ছিল টয় ট্রেনের চলার পথ। হিলকার্ট রোড দিয়ে পাহাড়ি ট্রেন ছুটে যাওয়ার সেই অপরূপ দৃশ্য আজ আর বাস্তবে দেখা যায় না, নেই সেই পুরনো রেললাইনও। কিন্তু ইতিহাসের সেই সোনালী সকালকে এবার নিখুঁতভাবে মণ্ডপের অন্দরে ফিরিয়ে আনছে মিত্র সম্মিলনী। একচালা মণ্ডপসজ্জায় নিখুঁত ছবি ও জীবন্ত দৃশ্যের মাধ্যমে ফুটে উঠবে পুরনো শিলিগুড়ির সেই দিনগুলি—রাজা-মহারাজাদের আগমন, গরুর গাড়িতে চেপে দর্শনার্থীদের যাতায়াত, পুজোর প্রাণবন্ত আড্ডা এবং ক্লাবের সামনে দিয়ে ধোঁয়া উড়িয়ে ছুটে চলা সেই চেনা টয় ট্রেন।
ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক সৌরভ ভট্টাচার্য জানান, এই পুজো কেবল একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, এটি শিলিগুড়ির দীর্ঘ ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। একসময় চা-বাগান থেকে দেশ-বিদেশের জমিদারেরা এখানে পুজো দেখতে আসতেন এবং এখানেই রাত্রিযাপন করতেন। বহু ঋষি-মনীষীর পদধূলি পড়েছে এই পুজো প্রাঙ্গণে, এমনকি খোদ ইংরেজ সাহেবরাও পুজো দেখতে আসতেন। সেই সমস্ত সোনালী স্মৃতিকেই এবার মণ্ডপে জীবন্ত করে তোলার চেষ্টা করা হচ্ছে। সময় বদলেছে, বদলেছে শিলিগুড়ির পুজোর আধুনিক ধরনও, কিন্তু থিমের প্রতিযোগিতার ভিড়েও মিত্র সম্মিলনী আজও আঁকড়ে ধরে রেখেছে একচালা প্রতিমা, চিরাচরিত পুজোর নির্ঘণ্ট এবং পুরনো সমস্ত পরম্পরা। ষষ্ঠী থেকে দশমী নির্দিষ্ট তিথি মেনে চলা এই পুজোয় অষ্টমীর সাবেকি ভোগ ও সারাদিনব্যাপী প্রসাদ বিতরণের আকর্ষণ আজও অটুট। শতবর্ষের এই সন্ধিক্ষণে মিত্র সম্মিলনীর পুজো তাই কেবল দেবী আরাধনা নয়, গল্পে গল্পে হারিয়ে যাওয়া এক পুরনো শিলিগুড়িকে নতুন করে খুঁজে পাওয়ার আবেগঘন আয়োজন।