বক্স অফিসে ছবি না চলার জন্য ৯০% দায়ী এঁরাই!’ স্বর্ণকমল জিতেই বিস্ফোরক মন্তব্য দেশের সেরা চলচ্চিত্র সমালোচকের

সিনেমার নিজস্ব এক অন্তর্নিহিত ভাষা থাকে, আর সেই ভাষাকে সাধারণ দর্শকের কাছে সহজ ও বোধগম্য করে তোলার কাজটি নিপুণভাবে করে চলেছেন একজন প্রকৃত চলচ্চিত্র সমালোচক। ঠিক এই দায়িত্বটিই গত তিন দশক ধরে অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করে আসছেন ‘টিভি৯ ভারতবর্ষ’-এর অ্যাসিস্ট্যান্ট এডিটর এবং বিশিষ্ট চলচ্চিত্র সমালোচক সঞ্জীব শ্রীবাস্তব। ভারতীয় চলচ্চিত্রে তাঁর এই দীর্ঘ, অনবদ্য ও নিরলস অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ ৭২তম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের মঞ্চে দেশের ‘শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র সমালোচক’ বা ‘বেস্ট ফিল্ম ক্রিটিক’-এর সম্মান অর্জন করেছেন তিনি। সম্প্রতি ‘টিভি৯ ভারতবর্ষ’-এর বিশেষ সাক্ষাৎকারে নিজের এই সুদীর্ঘ যাত্রা, বর্তমান সিনেমার গতিপ্রকৃতি এবং সমালোচনার নানা দিক নিয়ে খোলামেলা আড্ডায় মেতে ওঠেন এই বর্ষীয়ান সাংবাদিক।
গুজরাটের কেভাদিয়ায় আয়োজিত এক বর্ণাঢ্য ও ঐতিহাসিক অনুষ্ঠানে মহামান্য রাষ্ট্রপতির হাত থেকে ‘স্বর্ণকমল’, বিশেষ ব্যাজ এবং মর্যাদাপূর্ণ শংসাপত্র গ্রহণ করেছেন তিনি। পুরস্কার প্রাপ্তির সেই রোমাঞ্চকর মুহূর্ত স্মরণ করে সঞ্জীব জানান, পিআইবি-র সাংবাদিক বৈঠকের ঠিক আগে একটি অচেনা নম্বর থেকে তাঁর কাছে ফোন আসে। নিজের কানে নিজের নাম প্রথম ঘোষণা হতে শোনার সেই অভিজ্ঞতা ভাগ করে তিনি বলেন, “খবরটা যখন পাই, গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠেছিল। আমি একেবারে হতবাক ছিলাম। আজও যখন এই কথা বলছি, আমার গায়ে কাঁটা দিচ্ছে যে আমাকেও এই পুরস্কার দেওয়া হতে পারে।” এই অসামান্য সাফল্যের সমস্ত কৃতিত্ব ‘টিভি৯ ভারতবর্ষ’-কে উৎসর্গ করে তিনি জানান, প্রতিষ্ঠানের হিন্দি ওয়েবসাইটে সিনেমা নিয়ে লেখার পূর্ণ স্বাধীনতা পাওয়ার ফলেই তিনি স্বাধীনভাবে নিজের সেরাটা দিতে পেরেছেন।
চলচ্চিত্র সমালোচনা নিয়ে তাঁর ভাবনা অত্যন্ত স্পষ্ট ও পেশাদার। সমালোচকদের কখনও বিচারকের আসনে বসা উচিত নয় বলে মনে করেন তিনি। তাঁর কথায়, “চলচ্চিত্র সমালোচক মানেই বিচারপতি নন। সিনেমাটা আমার পছন্দ হয়নি বা খুব পছন্দ হয়েছে, এটা কখনওই ভালো সমালোচনা হতে পারে না।” ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দকে দূরে সরিয়ে রেখে ছবির গল্পের বুনন, অভিনয় এবং পরিচালকের মূল দৃষ্টিভঙ্গি কতটা সার্থক হলো, সেটাই নিখুঁতভাবে তুলে ধরা একজন সত্যিকারের সমালোচকের কাজ। আজকালকার রিভিউর মান নিয়ে গভীর আক্ষেপ প্রকাশ করে তিনি বলেন, “আজ যদি কোনো ভালো ছবি বক্স অফিসে মার খায়, তার পেছনে ৯০ শতাংশ অবদান থাকে খারাপ বা পক্ষপাতদুষ্ট রিভিউর।”
বর্তমান ভারতীয় সিনেমা প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে তিনি পরিচালকদের কাছে একটি বিশেষ অনুরোধ রাখেন। শুধুমাত্র হলিউড বা কোরিয়ান ছবির অনুকরণ না করে মুন্সি প্রেমচাঁদ বা ফণীশ্বরনাথ রেণুর মতো কিংবদন্তি সাহিত্যিকদের ধ্রুপদী রচনা যেমন ‘গোদান’, ‘গবন’ বা ‘ময়লা আঁচল’-এর ওপর ভিত্তি করে দেশীয় ও মাটির কাছাকাছি গল্প পর্দায় ফুটিয়ে তোলার পরামর্শ দেন তিনি। পাশাপাশি ওটিটি প্ল্যাটফর্মের প্রশংসাও করেন তিনি।
প্রায় তিন দশক আগে মহেশ ভাটের ‘সড়ক’ ছবির একটি গানের পর্যালোচনার মাধ্যমে তাঁর সাংবাদিকতা ও লেখার হাতেখড়ি হয়েছিল। ২০০০ সালে অমিতাভ বচ্চনকে নিয়ে লেখা একটি বিশেষ নিবন্ধ তাঁকে কেরিয়ারের বড় পরিচিতি এনে দেয়। সকাল ৭টায় বাড়ি থেকে বেরিয়ে ব্যাক-টু-ব্যাক একাধিক সিনেমা দেখে গভীর রাত পর্যন্ত রিভিউ লেখার কঠিন রুটিন আজও মেনে চলেন তিনি। ভবিষ্যতে হিন্দিতে সিনেমার খবর ও পর্যালোচনার জন্য একটি সম্পূর্ণ স্বাধীন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম তৈরি করার ইচ্ছে রয়েছে তাঁর। পাশাপাশি নিজের লেখা গল্প বা উপন্যাস নিয়ে ভবিষ্যতে সিনেমা তৈরি হোক, এই স্বপ্নই বুক বেঁধে রেখেছেন এই স্বর্ণকমল জয়ী সাংবাদিক।