রিয়াদজুড়ে কানফাটা সাইরেন, কেঁপে উঠল বিমানবন্দর! সৌদি আরবে ঝাঁকে ঝাঁকে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা হুথিদের

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের উত্তাপের মধ্যেই এবার সৌদি আরবের প্রাণকেন্দ্র রিয়াদসহ দেশের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি ও সামরিক স্থাপনায় একযোগে বড়সড় ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাল ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীরা। শনিবারের এই আচমকা হামলায় কেঁপে ওঠে সৌদির রাজধানী রিয়াদ। বিস্ফোরণের পর রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নিকটবর্তী আরামকো (Aramco) তেল কোম্পানির জ্বালানি ডিপোতে বিকট অগ্নিকাণ্ডের সৃষ্টি হয়। মুহূর্তের মধ্যে আকাশ ছেয়ে যায় কালো ধোঁয়ায়, যার জেরে ওই বিমানবন্দরে দীর্ঘ সময় বিমান চলাচল ব্যাহত হয়।

হুথিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া আল-সারিয়া অনলাইনে দেওয়া এক বিবৃতিতে দাবি করেছেন, তারা রিয়াদের সংবেদনশীল অবকাঠামো এবং ইয়ানবু শহরের আরামকোর তেল স্থাপনা লক্ষ্য করে একঝাঁক ক্ষেপণাস্ত্র ও আত্মঘাতী ড্রোন ছুড়েছে। তাঁর দাবি, গত এক সপ্তাহে ইয়েমেনে সৌদি জোটের প্রায় ৩০০টি বিমান হামলার পাল্টা জবাব হিসেবেই এই আক্রমণ চালানো হয়েছে।

অন্যদিকে সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, রিয়াদের আকাশসীমায় আসা একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সফলভাবে ধ্বংস করতে সক্ষম হয়েছে। এ ছাড়া বিশ, তাইফ, ফারাসান ও ইয়ানবু অভিমুখে ধেয়ে আসা বেশ কয়েকটি হামলাও মাঝপথেই ঠেকিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট। তবে বিমানবন্দরে উদ্ভূত পরিস্থিতি এবং আরামকোর ট্যাংকে আগুন লাগার পর দমকলকর্মীদের তা নেভানোর প্রচেষ্টা সামাল দিতে গিয়ে এলাকায় সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। রিয়াদ প্রশাসনের পক্ষ থেকে বাসিন্দাদের মোবাইলে জরুরি সতর্কবার্তা পাঠানো হয়েছিল।

লোহিত সাগরে হুথিদের মেগা পদক্ষেপ:

শুধু আকাশপথের হামলাই নয়, ভূ-রাজনৈতিক চাল হিসেবে ইয়েমেনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বন্দর শহর মোকা এবং পেরিম দ্বীপের (Perim Island) পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার কথা ঘোষণা করেছে হুথিরা। বাব আল-মান্দেব প্রণালির এই কৌশলগত সমুদ্রপথটি সৌদি আরবের অপরিশোধিত তেল রফতানি এবং বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম মূল জীবনরেখা। হুথি নেতৃত্বের সাফ বার্তা, ইয়েমেনের ওপর সৌদি জোটের আকাশ ও নৌ অবরোধের জবাব দিতেই তারা এই আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক সমুদ্রপথের রাশ নিজেদের হাতে নিয়েছে।

ইরানের সঙ্গে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের চলমান উত্তেজনায় হরমুজ প্রণালি কার্যত অচল হয়ে পড়ায় বিশ্ববাজারে তেল সরবরাহের ক্ষেত্রে সৌদি আরব এই লোহিত সাগরের পথের ওপরই সবচেয়ে বেশি নির্ভরশীল ছিল। হুথিদের এই পদক্ষেপের ফলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার তীব্র আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। খ্যাতনামা আর্থিক প্রতিষ্ঠান ‘জেপি মরগান’ (JPMorgan) এক বিবৃতিতে সতর্ক করে জানিয়েছে, এই যুদ্ধের পরিণতি ঠিক কোথায় গিয়ে ঠেকবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কতটা বাড়বে, তা এখনই অনুমান করা অসম্ভব।

ইয়েমেন সীমান্তে রক্তক্ষয়ী সংঘাত ও মার্কিন সতর্কবার্তা:

অসমর্থিত সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, গত শনিবার হুথি যোদ্ধা এবং সৌদি-সমর্থিত সরকারি বাহিনীর মধ্যে ইয়েমেনি সীমান্তে হওয়া রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে অন্তত ৪৮ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। এর মধ্যে ৩১ জন হুথি যোদ্ধা এবং ১৭ জন সরকারি বাহিনীর সেনা সদস্য বলে জানা গিয়েছে। জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (IOM) জানিয়েছে, লাগাতার এই সামরিক সংঘাতের কারণে ইতিমধ্যেই ইয়েমেনে ১ লাখ ৪ হাজারেরও বেশি মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে প্রাণ বাঁচাতে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।

পরিস্থিতির আশঙ্কাজনক অবনতি দেখে ওয়াশিংটনের তরফ থেকে চরম সতর্কবার্তা জারি করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট মধ্যপ্রাচ্যে থাকা তাদের নাগরিকদের যাতায়াতের বিষয়ে সতর্ক থাকতে নির্দেশ দিয়েছে এবং অবিলম্বে আমেরিকানদের ওই অঞ্চল ভ্রমণের সিদ্ধান্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। সামরিক এই সংঘাত খুব দ্রুত আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করছে আন্তর্জাতিক মহল।