বর্ষার শহরে ডেঙ্গুর আতঙ্ক! কোন মারাত্মক ভুলে মুহূর্তে ঘরে আসছে মশা?

বর্ষা এলেই দেশের প্রতিটি কোণ থেকে ডেঙ্গুর বাড়বাড়ন্তের খবর উদ্বেগ বাড়াতে শুরু করে। রাজধানী দিল্লি থেকে শুরু করে কলকাতা, মুম্বাই কিংবা চেন্নাই—মেট্রো শহরগুলোর আকাশ কালো করে বৃষ্টি নামলেই শুরু হয় ডেঙ্গুর মরসুম। চিকিৎসকদের মতে, এই সময় বাতাসে বাড়তি জলীয় বাষ্প, থেমে থেমে বৃষ্টি এবং ভ্যাপসা গরম—এই তিনের এক বিপজ্জনক ককটেল এডিস মশার বংশবৃদ্ধির জন্য একেবারে আদর্শ পরিবেশ তৈরি করে দেয়। ফলস্বরূপ, হু হু করে বাড়তে থাকে ডেঙ্গুতে আক্রান্তের সংখ্যা। স্বাস্থ্য দফতরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ইতিমধ্যেই আক্রান্তের সংখ্যা চার হাজারের গণ্ডি পার করেছে, যা প্রশাসনকে নতুন করে ভাবিয়ে তুলেছে।
অনেকেরই ভ্রান্ত ধারণা রয়েছে যে মশা বুঝি কেবল নোংরা ও বড় জলাশয়েই জন্মায়। কিন্তু ডেঙ্গুর বাহক ‘এডিস’ মশার চরিত্র সম্পূর্ণ আলাদা। এরা নোংরা জলে নয়, বরং মানুষের ঘরের আশপাশে জমে থাকা সামান্য পরিষ্কার জলেই ডিম পাড়ে। ঘরের ফুলের টব, ফেলে দেওয়া অব্যবহৃত পাত্র, পুরনো টায়ার, এয়ার কুলার কিংবা ছাদের ওপর জমে থাকা বৃষ্টির জলই এদের বংশবৃদ্ধির প্রধান আখড়া। টানা কয়েকদিন বৃষ্টির পর যখন হঠাৎ চড়া রোদ ও ভ্যাপসা গরম ফেরে, তখন এই মশার প্রজনন প্রক্রিয়া কয়েকগুণ বেড়ে যায়। চিকিৎসকরা জানাচ্ছেন, তাপমাত্রা বেশি থাকলে মশার শরীরের ভেতরে ডেঙ্গু ভাইরাসের ইনকিউবেশন পিরিয়ড বা বেড়ে ওঠার গতিও উল্লেখযোগ্যভাবে ত্বরান্বিত হয়।
দ্রুত নগরায়ন, অপরিকল্পিত কনস্ট্রাকশন, জনসংখ্যার চাপ এবং জঘন্য ড্রেনেজ ব্যবস্থা এই সমস্যাকে আরও শতগুণ জটিল করে তুলেছে। বাড়ি কিংবা অ্যাপার্টমেন্টের ব্যালকনি, বাগান বা ড্রেনে সামান্য জল জমলেই সেখানে বংশবিস্তার করে হাজার হাজার মশা। ঘনবসতিপূর্ণ শহরাঞ্চলে মানুষ কাছাকাছি বসবাস করায় রোগ ছড়ানোর গতিও হয় অত্যন্ত দ্রুত। একজন আক্রান্তকে কামড়ানোর পর সেই মশা যখন অন্য সুস্থ মানুষকে কামড়ায়, তখন মুহূর্তের মধ্যে ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। শারদাকেয়ার-হেলথসিটির ইন্টারনাল মেডিসিন বিভাগের সিনিয়র কনসালট্যান্ট ডঃ নীরজ কুমার বলেন, “বর্ষায় ডেঙ্গুর কেস বেড়ে যাওয়ার পিছনে আবহাওয়া, মশার দ্রুত বংশবৃদ্ধি এবং শহুরে পরিবেশের এক সরাসরি ও গভীর যোগসূত্র রয়েছে।”
ডেঙ্গুর হাত থেকে বাঁচতে এর লক্ষণগুলো সম্পর্কে ওয়াকিবহাল থাকা অত্যন্ত জরুরি। তীব্র জ্বর, সারা শরীরে মারাত্মক ব্যথা, চরম ক্লান্তি, নাগাড়ে বমি, পেটে তীব্র যন্ত্রণা, নাক বা মাড়ি থেকে রক্তপাত, প্রচণ্ড দুর্বলতা এবং জ্বর কমে যাওয়ার পরেও হঠাৎ শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়া হলো ডেঙ্গুর প্রধান লাল সঙ্কেত। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, বাড়ি বা তার আশপাশে কোথাও জল জমতে দেওয়া যাবে না এবং নিয়মিত মশার লার্ভা ধ্বংসে নজর রাখতে হবে। একটু সচেতনতাই পারে আপনাকে ও আপনার পরিবারকে এই ভয়াবহ রোগের হাত থেকে সম্পূর্ণ সুরক্ষিত রাখতে।