মৃত্যুকে বুড়ো আঙুল! বিরল স্নায়ুরোগ জয় করে মঞ্চে ফিরেই ইতিহাস গড়লেন সেলিন ডিওন!

দীর্ঘ তিন বছরের দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে সঙ্গীতের দুনিয়ায় এক রূপকথার মতো কামব্যাক করলেন বিশ্বখ্যাত পপ আইকন সেলিন ডিওন (Celine Dion)। প্যারিসের প্লেনিটিউড এরিনায় তাঁর রেসিডেন্সি শোয়ের প্রথম রাতেই তৈরি হয়েছে এক অবিশ্বাস্য ইতিহাস। বিগত বেশ কিছুদিন ধরে এক বিরল এবং মারাত্মক স্নায়ুরোগ ‘স্টিফ পার্সন সিনড্রোম’-এর সঙ্গে লড়াই করছিলেন তিনি। পেশিতে মারাত্মক টান, হাঁটাচলায় তীব্র সমস্যা এবং সবচেয়ে বড় কথা গান গাওয়ার ক্ষমতা হারিয়ে যাওয়ার মতো মারাত্মক সব ধাক্কা সামলে শনিবার রাতে তিনি যেভাবে মঞ্চে ফিরেছেন, তা দেখে হতবাক সঙ্গীত দুনিয়া। সমালোচকরা একবাক্যে সেলিনের এই প্রত্যাবর্তনকে আক্ষরিক অর্থেই ‘অলৌকিক’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।
২০২৩ সালে নিজের বিরল রোগের কথা প্রকাশ্যে এনে কড়া সংগ্রামের মুখে পড়েছিলেন এই কানাডিয়ান গায়িকা। বাধ্য হয়েই তাঁকে মঞ্চ থেকে দূরে সরে দাঁড়াতে হয়েছিল। তবে ২০২৪ সালে প্রকাশিত তাঁর প্রশংসিত তথ্যচিত্র ‘আই অ্যাম’-এ তিনি অত্যন্ত দৃঢ় কণ্ঠে ঘোষণা করেছিলেন, পরিস্থিতি যাই হোক না কেন, তিনি মঞ্চে ফিরবেনই। সেই তথ্যচিত্রে সেলিন দৃপ্ত কণ্ঠে বলেছিলেন, তিনি যদি দৌড়তে না পারেন তবে হাঁটবেন, আর হাঁটতে না পারলে হামাগুড়ি দিয়ে হলেও নিজের লক্ষ্যে পৌঁছাবেন—কিন্তু কোনোভাবেই থামবেন না। ঠিক সেই আজীবন মনে রাখার মতো প্রতিশ্রুতিই আজ অক্ষরে অক্ষরে পালন করে দেখালেন এই অদম্য পপ তারকা। প্রাথমিকভাবে প্যারিসে ১০টি শো হওয়ার কথা থাকলেও দর্শকদের বাঁধভাঙা চাহিদার কারণে তা বাড়িয়ে ১৬টিতে উন্নীত করা হয়। এমনকি আগামী ২০২৭ সালের মে মাসেও ঠিক একই মঞ্চে আরও ১০টি কনসার্ট করার পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর।
শনিবার রাতের ঐতিহাসিক শোয়ের শুরুতে অবশ্য গায়িকার মধ্যে সামান্য শারীরিক আড়ষ্টতা এবং স্নায়ুর চাপের লক্ষণ স্পষ্ট ধরা পড়েছিল। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ‘দ্য টেলিগ্রাফ’-এর ফোর-স্টার রিভিউ অনুযায়ী, কনসার্টের শুরুর দিকে নিজেকে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে রীতিমতো বড় লড়াই করতে হচ্ছিল তাঁকে। তাঁর গলা সামান্য কাঁপছিল এবং মনে হচ্ছিল এই বুঝি স্বর খাদে নেমে যাবে। কিন্তু দীর্ঘ অপেক্ষার পর মঞ্চের আলো ও দর্শকদের ভালোবাসা গায়ে মাখার পর প্রতিটি মুহূর্ত যেন তাঁকে নতুন করে আত্মবিশ্বাস জুগিয়েছে। যখন তিনি ‘এভরিথিং আই অ্যাম’ গানের অত্যন্ত জটিল ও কঠিন নোটগুলো নিখুঁতভাবে গেয়ে শোনালেন, তখন শিল্পী ও উপস্থিত হাজার হাজার দর্শকের চোখমুখ একরাশ স্বস্তিতে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম যেমন ‘দ্য টাইমস’, ‘দ্য গার্ডিয়ান’, এবং ‘দ্য মিরর’-এর সমালোচকরা এই কনসার্টের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। ‘দ্য টাইমস’ একে অত্যন্ত আন্তরিক ও পেশাদার শো হিসেবে উল্লেখ করে জানিয়েছে, যেভাবে তিনি মঞ্চে পারফর্ম করেছেন তাতে এক মুহূর্তের জন্যও মনে হয়নি তাঁর কোনো গুরুতর স্নায়ুরোগ রয়েছে। অন্যদিকে ‘দ্য মিরর’ একে প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে এক অসামান্য প্রত্যাবর্তন বলে বর্ণনা করেছে। কনসার্টের মঞ্চসজ্জা এবং আধ্যাত্মিক আবহ পুরো অনুষ্ঠানটিকে এক অন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিল। ফরাসি ও ইংরেজি উভয় ভাষার জনপ্রিয় গানে মঞ্চ কাঁপানোর পাশাপাশি ‘মাই হার্ট উইল গো অন’ এবং ‘দ্য পাওয়ার অফ লাভ’-এর মতো চিরসবুজ গানগুলোর আইকনিক হাই নোটে পৌঁছানোর পর তাঁর মুখের স্বস্তি ও বিজয়ের অভিব্যক্তি প্রমাণ করে দিয়েছে এই লড়াই কতখানি কঠিন ছিল।