সম্পর্কের টানাপোড়েন আর লুকোনো আবেগের সংঘাত! প্রথম ছবিতেই বড় চমক দিতে চলেছেন সালঙ্কো-আনন্দরূপ

মানুষের জীবনে এমন অনেক কথা থাকে, যা চাইলেও মুখে বলা যায় না। কখনও ভালোবাসা থেমে যায় অভিমানে, কখনও পুরনো স্মৃতি বর্তমানকে প্রভাবিত করে, আবার কখনও মনের ভিতরে জমে থাকা যন্ত্রণা সম্পর্কের সমীকরণ বদলে দেয়। সেই না-বলা অনুভূতি, সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং মানুষের মনের অন্দরমহলের গল্প নিয়েই তৈরি হচ্ছে নতুন বাংলা ছবি ‘মৌনাক্ষর’। সালঙ্কো বন্দ্যোপাধ্যায় ও আনন্দরূপ চট্টোপাধ্যায়ের পরিচালনায় এটি তাঁদের প্রথম ছবি। ছবির গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে দেখা যাবে সৌম্য মুখোপাধ্যায়, প্রান্তিকা দাস এবং সুদীপা বসুকে।

সালঙ্কো বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা গল্পের কেন্দ্রে রয়েছে মানুষের ব্যক্তিগত অনুভূতি, সম্পর্ক এবং জীবনের নানা অভিজ্ঞতা। খুব বড় কোনও নাটকীয়তার বদলে গল্প এগোবে বাস্তব জীবনের কাছাকাছি থাকা আবেগ ও পরিস্থিতিকে ঘিরে। মানুষ অতীত থেকে কী কী স্মৃতি নিজের সঙ্গে বয়ে নিয়ে চলে, সেই স্মৃতিগুলি কীভাবে তার সম্পর্ক, মানসিকতা এবং জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলিকে প্রভাবিত করে, ছবিতে সেই জায়গাগুলিই তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে।

ছবির পরিচালক এবং চিত্রনাট্যকার সালঙ্কো বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথায়, “মৌনাক্ষর তৈরি হয়েছে একটি খুব সহজ কিন্তু গভীর ভাবনাকে সামনে রেখে। আমাদের জীবনে এমন অনেক অনুভূতি থাকে, যেগুলিকে শব্দে প্রকাশ করা সবসময় সম্ভব হয় না। সেই অনুভূতিগুলিকেই গল্পের মাধ্যমে তুলে ধরতে চেয়েছি। ভালোবাসা, যন্ত্রণা, স্মৃতি, সম্পর্ক এবং জীবনের সঙ্গে বয়ে নিয়ে চলা মানসিক বোঝা এই ছবির গল্পের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।”

তিনি আরও জানিয়েছেন, ছবিতে বাস্তবতাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তাঁর কথায়, “গল্পের কোনও অংশকেই জীবনের চেয়ে বড় করে দেখাতে চাইনি। মানুষের সম্পর্ক, আবেগ, লড়াই এবং ব্যক্তিগত অনুভূতিই এই গল্পের মূল শক্তি। আমরা কীভাবে নিজেদের অনুভূতিগুলিকে সামলে রাখি, অতীতকে আঁকড়ে থাকি এবং একটা সময় সেই অতীত থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করি, ‘মৌনাক্ষর’ মূলত সেই পথ চলার গল্প। দর্শক ছবিটি দেখতে গিয়ে নিজেদের জীবনের কোনও অনুভূতির সঙ্গে হয়তো গল্পের মিল খুঁজে পাবেন।”

সালঙ্কোর সঙ্গে ছবিটি পরিচালনার পাশাপাশি সহ-চিত্রনাট্যও লিখেছেন আনন্দরূপ চট্টোপাধ্যায়। প্রথম ছবিতেই মানুষের সম্পর্কের সূক্ষ্ম দিক এবং চরিত্রগুলির ভিতরের দ্বন্দ্বকে সামনে আনতে চেয়েছেন তিনি। আনন্দরূপের বক্তব্য, “মৌনাক্ষর-এর মাধ্যমে সম্পর্কের এমন কিছু জায়গা দেখাতে চেয়েছি, যা সবসময় সরাসরি প্রকাশ পায় না। একটি সম্পর্ক কতটা গভীর, তা শুধু কথাবার্তা দিয়ে বোঝা যায় না। মানুষের আচরণ, দৃষ্টিভঙ্গি এবং ছোট ছোট মুহূর্তের মধ্যেও অনেক অনুভূতি লুকিয়ে থাকে।”

গল্প বলার ক্ষেত্রে সহজ কোনও নাটকীয় সমাধানের পথে হাঁটেননি তাঁরা। আনন্দরূপ বলেন, “এই ছবিতে কোনও বড়সড় নাটকীয়তা বা সহজ সমাধান দেখানোর চেষ্টা করিনি। বরং চরিত্রগুলির ব্যক্তিগত অনুভূতি এবং নিজেদের সঙ্গে চলতে থাকা লড়াইটাকে স্বাভাবিকভাবে তুলে ধরতে চেয়েছি। সৌম্য এবং প্রান্তিকার অভিনয় সেই আবেগকে আরও শক্তিশালী করেছে। একজন নতুন পরিচালক হিসেবে এই ছবিটি আমার কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা।”

ছবির অন্যতম প্রধান চরিত্রে রয়েছেন প্রান্তিকা দাস। ‘মৌনাক্ষর’ তাঁর কাছেও আলাদা অভিজ্ঞতা, কারণ এই ছবিতে প্রথমবার সৌম্য মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে জুটি বেঁধে কাজ করছেন তিনি। দুই নবাগত পরিচালকের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতাও তাঁর কাছে বিশেষ।

প্রান্তিকার কথায়, “আনন্দরূপ দা এবং সালঙ্কোর পরিচালনায় ‘মৌনাক্ষর’-এর মুখ্য চরিত্রে অভিনয় করতে পেরে আমি খুবই খুশি। ওঁদের গল্প বলার ধরন আমার ভালো লেগেছে। প্রথম ছবি হিসেবে এতটা আলাদা ধরনের একটি গল্প নিয়ে কাজ করার সুযোগ পাওয়া আমার কাছে সত্যিই বিশেষ।”

নিজের চরিত্র প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “সৌম্যর সঙ্গে এটিই আমার প্রথম কাজ। গল্পের নানা পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে আমাদের চরিত্রগুলি এগিয়ে যায় এবং তাদের অনেক অনুভূতিই খুব স্বাভাবিকভাবে প্রকাশ পায়। এর আগে এই ধরনের চরিত্রে আমি কাজ করিনি। তাই চরিত্রটি আমার কাছে একদিকে নতুন, অন্যদিকে যথেষ্ট চ্যালেঞ্জিং। আশা করি দর্শক গল্প এবং চরিত্রগুলির মধ্যে নিজেদের জীবনের কোনও সম্পর্ক খুঁজে পাবেন।”

ছবিতে অর্জুনের চরিত্রে অভিনয় করছেন সৌম্য মুখোপাধ্যায়। তাঁর মতে, গল্পের নিজস্ব উপস্থাপনা এবং চরিত্রের একাধিক স্তর ‘মৌনাক্ষর’-এর অন্যতম আকর্ষণ। সৌম্য বলেন, “আমার কাছে ছবিটির সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় হল এর গল্প বলার ধরন। এখানে এমন কিছু কথা রয়েছে, যা চরিত্রগুলি বলতে পারে না বা বলা হয়ে ওঠে না। একজন অভিনেতা হিসেবে সেই না-বলা অনুভূতিগুলিকে পর্দায় ফুটিয়ে তোলার সুযোগটা আমার কাছে খুবই আকর্ষণীয় ছিল।”

প্রান্তিকার সঙ্গে প্রথমবার কাজ করা নিয়েও উচ্ছ্বসিত সৌম্য। তাঁর কথায়, “প্রান্তিকার সঙ্গে এটিই আমাদের প্রথম কাজ। আমাদের দুই চরিত্রের সম্পর্কও গল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আমার চরিত্রের নাম অর্জুন। চরিত্রটির একাধিক স্তর রয়েছে এবং গল্প এগোনোর সঙ্গে সঙ্গে সেই স্তরগুলি ধীরে ধীরে দর্শকের সামনে আসবে। আমার মনে হয়, আমাদের প্রজন্মের অনেকেই অর্জুনের কিছু অনুভূতির সঙ্গে নিজেদের মিল খুঁজে পাবেন।”

ছবিতে সৌম্যর মায়ের চরিত্রে দেখা যাবে সুদীপা বসুকে। তাঁর চরিত্রের মধ্য দিয়ে গল্পে পারিবারিক সম্পর্ক, দুই প্রজন্মের মানসিকতার পার্থক্য এবং কাছের মানুষদের মধ্যে লুকিয়ে থাকা আবেগের আরও একটি দিক উঠে আসবে।

সালঙ্কো বন্দ্যোপাধ্যায় এবং আনন্দরূপ চট্টোপাধ্যায়ের প্রথম ছবি হিসেবে ‘মৌনাক্ষর’ তাই একসঙ্গে একাধিক সম্পর্ক ও অনুভূতির জায়গাকে ধরতে চাইছে। বাস্তব জীবনের কাছাকাছি থাকা গল্প, চরিত্রের মানসিক দ্বন্দ্ব, সম্পর্কের জটিলতা এবং প্রকাশ না পাওয়া আবেগকে কেন্দ্র করে তৈরি এই ছবিতে সৌম্য মুখোপাধ্যায়, প্রান্তিকা দাস এবং সুদীপা বসুর অভিনয় গল্পের পরিসরকে আরও গভীর করবে।