‘আমি সুপারওম্যান নই!’ অসুস্থতার দিনেও বডি শেমিংয়ের শিকার, মুখ খুললেন জনপ্রিয় অভিনেত্রী

ক্যানসারের মতো মারণ রোগের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরেই জীবনের সবচেয়ে কঠিন লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন জনপ্রিয় টেলিভিশন অভিনেত্রী দীপিকা কক্কর। চিকিৎসা চলাকালীন তাঁর শরীরে একাধিক শারীরিক পরিবর্তন এসেছে। ভারী ওষুধের প্রভাবে একদিকে যেমন ওজন অতিরিক্ত পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছে, তেমনই অন্যদিকে দেখা দিয়েছে মুড স্যুইং, মারাত্মক ক্লান্তি, শারীরিক দুর্বলতা এবং বমি হওয়ার মতো একাধিক সমস্যা। ক্যামেরার সামনে হাসিমুখে থাকলেও পর্দার আড়ালে এই নায়িকাকে প্রতিদিন এক মর্মান্তিক যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে দিন কাটাতে হচ্ছে। তবে শারীরিক এই অসুস্থতার পাশাপাশি তাঁকে প্রতিনিয়ত লড়াই করতে হচ্ছে এক নির্মম সামাজিক মানসিকতার বিরুদ্ধেও। বর্তমানে রূপালী পর্দা থেকে দূরে সরে থাকলেও তিনি নিয়মিত ভ্লগিংয়ের মাধ্যমে অনুরাগীদের সঙ্গে নিজের দৈনন্দিন জীবনের নানা আপডেট শেয়ার করে নেন। কিন্তু সুস্থতার এই জার্নি যে কতটা কণ্টকাকীর্ণ, তা সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে অকপটে স্বীকার করে নিয়েছেন এই অভিনেত্রী।
সম্প্রতি নিজের একটি ভ্লগে দীপিকা কক্কর তাঁর শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কথা বলতে গিয়ে এক চাঞ্চল্যকর ও মর্মান্তিক অভিজ্ঞতার কথা শেয়ার করেন। তিনি জানান, অসুস্থতার সময়ে তাঁর শরীরে ওষুধের বিপুল প্রতিকূল প্রভাব পড়েছিল, যার জেরে তাঁর ওজন হু হু করে বেড়ে যায়। কিন্তু সেই কঠিন সময়েও সমাজ তাঁকে এক মুহূর্তের জন্যও রেয়াত করেনি। সোশ্যাল মিডিয়ায় তাঁর ছবি পোস্ট হওয়া মাত্রই তা নিয়ে শুরু হয়ে যেত তীব্র কটাক্ষ এবং ট্রোলিং। মানুষ তাঁর ওজন বৃদ্ধি নিয়ে প্রকাশ্যে বডি শেমিং করতে শুরু করে। দীপিকার কথায়, অসুস্থতার সেই অন্ধকার দিনগুলিতে তিনি সোশ্যাল মিডিয়ার সমস্ত মন্তব্য পড়তেন এবং মানুষের এই ধরনের নিষ্ঠুর মন্তব্য তাঁর মানসিক অবস্থাকে আরও বেশি ভেঙে চুরমার করে দিয়েছিল। অথচ সেই সময়ে তাঁর শারীরিক অবস্থা এমন ছিল না যে তিনি জিমে গিয়ে ঘাম ঝরিয়ে ওজন কমানোর মতো কোনো কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন।
অভিনেত্রী আরও স্পষ্ট করে জানান যে তাঁর এই দীর্ঘস্থায়ী লড়াইটি কেবল শারীরিক নয়, এটি তাঁর মানসিক স্থায়িত্বেরও এক কঠিন পরীক্ষা। ক্যানসার এবং চিকিৎসার ধকল সামলাতে গিয়ে মাঝে মাঝে তিনি তীব্র অবসাদের শিকার হতেন। আর সেই মানসিক অবসাদের কারণেই অনেক সময়ে তাঁর অতিরিক্ত খাওয়ার প্রবণতা তৈরি হতো। লাখো চেষ্টা করেও তিনি নিজের এই পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারতেন না, যার ফলে ওজন কমানোর কাজটি তাঁর কাছে এক প্রকার অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল ক্যানসারের চিকিৎসায় ব্যবহৃত কড়া সব ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া। সমাজের এই বেহায়া ট্রোলাররা একবারের জন্যও ভেবে দেখেনি যে একজন মানুষ কতটা মারাত্মক অসুস্থতার মধ্য দিয়ে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন।
তবে সমস্ত প্রতিকূলতা পেরিয়ে দীপিকা এখন জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত ইতিবাচকভাবে কাটানোর চেষ্টা করছেন। তিনি জানান, জীবনে এত বড় একটা সংকটের মুখোমুখি হওয়ার পর তিনি বুঝতে পেরেছেন যে নিজের মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের যত্ন নেওয়া কতটা জরুরি। সেই উপলব্ধি থেকেই তিনি এখন নিজের ত্বক এবং চুলের নিয়মিত যত্ন নেওয়া শুরু করেছেন। অভিনেত্রী বলেন, তিনি কোনো অতিমানবী নন যে তাঁর ওপর কোনো ক্লান্তি বা অবসাদ প্রভাব ফেলবে না। যেদিন তাঁর শরীর অত্যন্ত খারাপ থাকে, সেদিন তিনিও অন্যান্য সাধারণ মানুষের মতো বিছানা থেকে উঠতে পারেন না এবং সারাদিন শুয়েই কাটান। শরীরে কোনো শক্তি থাকে না। তবে যেদিন শরীর একটু সায় দেয় এবং কিছুটা ভালো বোধ করেন, সেদিন তিনি বিছানা ছেড়ে উঠে নিজের মতো করে একটু সেজেগুজে থাকার চেষ্টা করেন, চুল ঠিক করেন এবং নিজের যত্ন নেন যাতে আয়নার সামনে নিজেকে একটু স্বাভাবিক ও সুস্থ মনে হয়। তাঁর এই লড়াই আজ হাজার হাজার ক্যানসার জয়ী ও অসুস্থ মানুষের মনে নতুন করে বেঁচে থাকার সাহস জোগাচ্ছে।