জঙ্গলমহলে চরম চমক! লাল পিঁপড়ের ডিম থেকে ধনুর্বিদ্যা—কী নেই বেলপাহাড়ির নতুন আদিবাসী গ্রামে?

লাল মাটির দেওয়াল জুড়ে আদিম জীবনের জীবন্ত আলপনা, বাতাসে মাদলের বোল আর শালপাতায় সাজানো কুরকুট পোড়ার সুবাস। এবার শুধু ছুঁয়ে দেখা নয়, জঙ্গলমহলের আদিবাসী সংস্কৃতির গভীরে অবগাহন করার সুযোগ পাবেন পর্যটকরা। দার্জিলিং কিংবা সিকিমের ধাঁচে ঐতিহ্যবাহী পাঞ্চি শাড়ি বা গান্দো ধুতি পরে ছবি তোলার হাতছানি নিয়ে বেলপাহাড়ির বুকে গড়ে উঠছে এক আদর্শ আদিবাসী জনপদ। প্রকল্পের নাম দেওয়া হয়েছে জঙ্গলমহল গ্রাম্য জীবন। এই জনপদে পর্যটনের হাত ধরে অর্থনৈতিক বিপ্লব ঘটাতে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের বরাদ্দ করা প্রায় ১১ কোটি টাকার তহবিল দিয়ে এই অভিনব প্রকল্প রূপায়ণে কোমর বেঁধে নেমেছে বন দফতর।
শিমুলপাল অঞ্চলের বালিচুয়ার পাহাড়ি টিলার ওপর প্রায় দুই হেক্টর জায়গা জুড়ে সেজে উঠছে এই মডেল গ্রাম। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে পাথরের মেঝে, মাটির দেওয়াল ও কাঠের ছাদে তৈরি হচ্ছে ১৫টি কুটির। তার মধ্যে আটটি ঘর জুড়ে গড়ে উঠছে আদিবাসীদের ইতিহাস ও জীবনযাত্রার সমৃদ্ধ মিউজিয়াম এবং বাবুই ঘাস ও পাথরের শিল্পকর্মের বিপণন কেন্দ্র। বাকি ছ’টি ঘর সংরক্ষিত থাকবে পর্যটকদের প্রকৃতির কোলে রাত্রিযাপনের জন্য। থাকছে খোলামেলা মঞ্চ, যেখানে রোজ সাঁঝের আলোয় স্থানীয় শিল্পীরা পরিবেশন করবেন ধামসা-মাদলের সুর ও ঐতিহ্যবাহী লোকনৃত্য। সম্পূর্ণ সৌরবিদ্যুৎ চালিত এই গ্রামে বৃষ্টির জল ধরে রেখে ব্যবহারের আধুনিক পরিকাঠামোও রাখা হচ্ছে।
খাবারের পাতে জঙ্গলমহলের স্বাদ পৌঁছে দিতে রসনা তৃপ্তির এলাহি আয়োজন থাকছে এই পর্যটনকেন্দ্রে। লাল পিঁপড়ের ডিম বা কুরকুটের চাটনি, অমলেট থেকে শুরু করে শাল পাতায় পোড়া দেশি মুরগি, বাঁশের চোঙে তৈরি ব্যাম্বু চিকেন কিংবা আদিবাসীদের নিজস্ব মাংসের পিঠে, সবই মিলবে এক ছাদের তলায়। পাহাড়ের মাথায় পৌঁছনোর জন্য তৈরি হচ্ছে নান্দনিক পাথরের সিঁড়ি। পাহাড়ের নিচে গড়ে হচ্ছে বিনোদনের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা, যেখানে ছিপ ফেলে পুকুরে মাছ ধরার সুযোগ যেমন মিলবে, তেমনই আধুনিক আর্চারি জোনে পর্যটকরা আদিবাসী ধনুর্বিদদের থেকে সরাসরি শিখতে পারবেন লক্ষ্যভেদের কৌশল।
প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে পাহাড়ি প্রকৃতির নৈসর্গিক রূপ উপভোগের পাশাপাশি কর্মসংস্থানের এক বিরাট দিগন্ত খুলে যাবে বলে আশাবাদী স্থানীয় প্রশাসন ও পর্যটন বিশেষজ্ঞরা। বিনপুরের বিধায়ক প্রণত টুডুর কথায়, ভারী শিল্পবিহীন এই প্রত্যন্ত অঞ্চলে স্থানীয় যুবসমাজ ও হস্তশিল্পীদের বিকল্প আয়ের ঠিকানা হতে চলেছে এই মডেল ভিলেজ। পশ্চিমবঙ্গ সরকার স্বীকৃত পর্যটন সংস্থার কর্তাদেরও দাবি, এই প্রকল্প চালু হলে বেলপাহাড়ির রুক্ষ পাথুরে প্রকৃতি পর্যটকদের নতুন জোয়ারে মুখরিত হয়ে উঠবে। সব মিলিয়ে, টিকিট ব্যবস্থার মাধ্যমে সুষ্ঠু রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করে জঙ্গলমহলের মাটির গন্ধ আর ঐতিহ্যকেই এবার পর্যটন মানচিত্রে প্রধান সম্পদ করতে চলেছে বেলপাহাড়ি।