পুজোর আমিষ-নিরামিষ বিতর্কের মাঝেই বিস্ফোরক তথ্য! জানেন কি পশ্চিমবঙ্গে বছরে কত কোটি কেজি মাংস উৎপাদন হয়?

দুর্গাপুজোর আনন্দ আর উদযাপনের আবহেই সম্প্রতি আমিষ ও নিরামিষ খাওয়া নিয়ে রাজনৈতিক ও সামাজিক মহলে এক নতুন বিতর্ক দানা বেঁধেছে। বাগেশ্বর ধামের প্রধান তথা ধীরেন্দ্র কৃষ্ণ শাস্ত্রী (যিনি ‘বাগেশ্বর বাবা’ নামেই সমধিক পরিচিত) পুজোর পবিত্র দিনগুলিতে আমিষ খাবার পুরোপুরি বর্জন করে নিরামিষ আহার গ্রহণের জোরালো পরামর্শ দেন। তাঁর এই নিদান প্রকাশ্যে আসার পরেই রাজ্যজুড়ে তীব্র রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্ক শুরু হয়। বিজেপি নেতা শমিক ভট্টাচার্য-সহ একাধিক বিশিষ্ট রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব এই নির্দেশ সরাসরি খারিজ করে স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন যে, বাঙালি কী খাবে বা কী পরবে, সেই সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণভাবে তাদের নিজেদের। খাদ্যাভ্যাসের মতো ব্যক্তিগত বা সাংস্কৃতিক বিষয়ের ওপর জোর করে কোনো নিদান চাপিয়ে দেওয়া কখনোই বরদাস্ত করা যায় না। পুজোর মৌসুমে আমিষ খাওয়া নিয়ে এই রাজনৈতিক তরজা আগামী দিনেও বেশ কিছুদিন অব্যাহত থাকবে বলেই রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা।
তবে এই সমস্ত বিতর্কের ভিড়ে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও চমকপ্রদ তথ্য সামনে এসেছে, যা অনেকেরই অজানা। আপনি কি জানেন, এই রাজ্যে প্রতি বছর ঠিক কত কেজি মাংস উৎপাদন করা হয়? মাংসের বিপুল চাহিদা এবং জমজমাট ব্যবসার নিরিখে পশ্চিমবঙ্গ বর্তমানে দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় রাজ্যগুলির মধ্যে নিজের অবস্থান শক্ত করে নিয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকারের পশুপালন ও মৎস্য মন্ত্রক প্রকাশিত সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবর্ষে পশ্চিমবঙ্গে প্রায় ১২.৯৪ লক্ষ টন মাংস উৎপাদন হয়েছিল। ঠিক তার পরের বছর অর্থাৎ ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষে এই উৎপাদনের পরিমাণ আরও কিছুটা বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় ১৩.০৮ লক্ষ টনে গিয়ে ঠেকেছে। অর্থাৎ, কেজির হিসেবে হিসাব করলে এই বিশাল পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১৩০ কোটি কেজি! ভারতের মোট মাংস উৎপাদনের একটি অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য অংশ উৎপাদিত হয় এই রাজ্য থেকেই।
রাজ্যে উৎপাদিত এই বিশাল পরিমাণ মাংসের মধ্যে বিভিন্ন পশুপাখির উপস্থিতি লক্ষ করা যায়, যার মধ্যে মুরগি বা পোল্ট্রি, ছাগল (যাকে স্থানীয় ভাষায় খাসির মাংস বা মাটন বলা হয়), ভেড়া, শূকর এবং গবাদি পশুর মাংস অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। রাজ্যে বার্ষিক মাংসের প্রাপ্যতা ও মাথাপিছু ভোগের গড় পরিমাণ প্রায় ১৩.১ কিলোগ্রাম। এর মধ্যে পোল্ট্রি বা মুরগির মাংসের উৎপাদন একাই প্রায় ৭১০ হাজার টন দখল করে সিংহভাগ অংশ জুড়ে রয়েছে। এর পরেই দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে খাসির মাংস বা মাটন, এবং তুলনামূলকভাবে কম পরিমাণে গবাদি পশু ও ভেড়ার মাংস উৎপাদিত হয়।
অবশ্য এখানে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত তফাত স্পষ্ট করা প্রয়োজন। খাতা-কলমে মাংস উৎপাদনের সরকারি পরিসংখ্যান এবং বাজারে প্রত্যক্ষভাবে মোট মাংস বিক্রির পরিমাণ হুবহু এক নয়। উৎপাদনের এই বিপুল পরিমাণের পাশাপাশি রাজ্যের বাইরে মাংস রপ্তানি করা, ভিন রাজ্য থেকে মাংস আমদানি করা, হিমঘরে সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াকরণ এবং বিভিন্ন ধাপে বাণিজ্যের জটিল চক্রের কারণে প্রতি বছর ঠিক কত কেজি মাংস সরাসরি বিক্রি বা ভোগ করা হয়, তার সুনির্দিষ্ট আলাদা সরকারি হিসাব সবসময় উপলব্ধ থাকে না।
তবুও কেন্দ্রীয় সরকারি পরিসংখ্যানের ওপর ভিত্তি করে এটি নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, পশ্চিমবঙ্গে প্রতি বছর প্রায় ১৩০ কোটি কেজি মাংসের বিশাল উৎপাদন হয়ে থাকে। এই বিপুল উৎপাদনের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত রয়েছে পশুপালন, বৃহৎ পোলট্রি শিল্প, নিরাপদ পরিবহন ব্যবস্থা, খুচরো ও পাইকারি মাংসের দোকান-সহ একটি সুবিশাল অর্থনৈতিক চক্র। অর্থাৎ, শুধুমাত্র বাঙালির রসনাবিলাস বা খাদ্যাভ্যাসের বিতর্কই নয়, মাংস উৎপাদন এবং তার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত বাণিজ্যিক পরিকাঠামো পশ্চিমবঙ্গের সামগ্রিক গ্রামীণ ও শহুরে অর্থনীতিতে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সুদূরপ্রসারী ভূমিকা পালন করে চলেছে।