বছরে ৫০ জনের মৃত্যুর মিছিলে অবশেষে লাগাম! উত্তরবঙ্গের জঙ্গলে ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত কেন্দ্রের

উত্তরবঙ্গের ডুয়ার্সে মানুষ ও হাতির সংঘাত দীর্ঘদিনের এক মর্মান্তিক বাস্তবতা। খাবারের খোঁজে জঙ্গল থেকে বেরিয়ে আসা বুনো হাতির দলের হানায় প্রতি বছর যেমন বহু মানুষের প্রাণ যায়, তেমনই লোকালয়ের রোষে বা দুর্ঘটনার কবলে পড়ে প্রাণ হারায় অসংখ্য নিরীহ গজরাজ। বহু বছরের এই রক্তক্ষয়ী সমস্যার স্থায়ী সমাধানে অবশেষে বড়সড় আশার আলো দেখা গেল।

দীর্ঘ দুই দশকের প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে ডুয়ার্সের দুটি প্রাচীন হাতির চলাচলের পথ বা ‘করিডর’ পুনর্দখল ও পুনরুদ্ধারের কাজ শুরু হতে চলেছে। সম্প্রতি কেন্দ্রীয় বন ও পরিবেশ মন্ত্রকের তরফে এই প্রকল্পের চূড়ান্ত ছাড়পত্র মিলেছে। এর ফলে বুনো হাতির দল লোকালয় এড়িয়ে নিজেদের সুনির্দিষ্ট চেনা পথেই যাতায়াত করতে পারবে, যা মানুষ-হাতি সংঘাত অনেকটাই কমিয়ে আনবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

কোন দুটি গুরুত্বপূর্ণ করিডর ছাড়পত্র পেল?

ডুয়ার্সের বনাঞ্চলে অবাধ বিচরণের জন্য যে দুটি অতি-সংবেদনশীল করিডর পুনরুদ্ধারের সবুজ সংকেত এসেছে, সেগুলি হলো: ১. রেতি-তিতি করিডর (ভুটান পাহাড় সংলগ্ন) ২. জলদাপাড়া-চিলাপাতা-বক্সা ব্যাঘ্র প্রকল্প-নিমতি করিডর

বন দপ্তরের মূল লক্ষ্য, এই চেনা পথগুলিতে হাতির দল যাতে মানুষের তৈরি কোনো বাধার সম্মুখীন না হয়ে সম্পূর্ণ স্বাধীন ও নিরাপদভাবে যাতায়াত করতে পারে।

মৃত্যুর মিছিল থামাতে মরিয়া প্রশাসন

ডুয়ার্সের বর্তমান পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। বন দপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ওই অঞ্চলে হাতি ও মানুষের সংঘাতের জেরে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৫০ জন মানুষের মৃত্যু হয় এবং অন্তত ১০টি হাতি মারা যায়।

বনকর্তাদের মতে, মানুষ ও হাতির সংঘাত কমানোর মূল চাবিকাঠি দুটি—প্রথমত, জঙ্গলের ভেতরে বন্যপ্রাণীদের পর্যাপ্ত খাবারের ব্যবস্থা করা এবং দ্বিতীয়ত, তাদের ঐতিহ্যবাহী প্রাচীন যাতায়াতের পথগুলি মানুষের দখলমুক্ত করে ফিরিয়ে দেওয়া। ২০০৩-০৪ সাল নাগাদ তৎকালীন অবিভক্ত জলপাইগুড়ি জেলায় বন দপ্তর চারটি বড় করিডর চিহ্নিত করলেও জমি হস্তান্তরের জটিলতায় তা রূপায়ণ করা যায়নি।

চা-বাগান উপড়ে উদ্ধার হবে হাতির পথ

নতুন এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা বন দপ্তরের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ, কারণ চিহ্নিত পথগুলির অনেকটাই বর্তমানে চা-বাগান ও স্থানীয় বসতির দখলে চলে গেছে।

বন দপ্তরের এক শীর্ষ আধিকারিক জানান, আগামী অর্থবছরের শুরুতেই পুনরুদ্ধারের কাজ জোরকদমে শুরু হবে। চা-বাগানের দখলে থাকা অংশে প্রয়োজন হলে চা-গাছ উপড়ে ফেলে বাগান কর্তৃপক্ষকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ প্রদান করা হবে। প্রাথমিক পর্যায়ে হাতির যাতায়াতের সুবিধার্থে করিডরের দু’পাশে সাময়িক বেড়া দেওয়া হবে, যা হাতিরা পথটিতে অভ্যস্ত হয়ে গেলে সরিয়ে নেওয়া হবে।

উল্লেখ্য, ২০০৩ সালে চিহ্নিত অন্য দুটি করিডর (ধুমচি-তিলি-লঙ্কাপাড়া-বান্দাপানি এবং গোরুমারা-খয়েরকাটা-ডায়ানা) এখনও কেন্দ্রীয় ছাড়পত্রের অপেক্ষায় রয়েছে। তবে আপাতত যে দুটি করিডরের ছাড়পত্র মিলেছে, তা দ্রুত কার্যকর করে উত্তরবঙ্গের বনাঞ্চলে শান্তি ও নিরাপত্তা ফেরাতে কাটছাঁট কৌশল নিয়ে এগোচ্ছে বন দপ্তর।