ভুল করে ভারতীয় নাগরিককে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দিল পুলিশ! গুয়াহাটি হাইকোর্টের নির্দেশে রাজ্যজুড়ে শুরু চরম শোরগোল

আইনি নির্দেশিকা ও নির্ধারিত নিয়মকানুনকে সম্পূর্ণ বুড়ো আঙুল দেখিয়ে একজন ভারতীয় নাগরিককে জোর করে বাংলাদেশে পুশব্যাক করার ঘটনায় রাজ্য প্রশাসনের বিরুদ্ধে অত্যন্ত কঠোর অবস্থান নিয়েছে আদালত। নির্বাসন সংক্রান্ত সমস্ত আইনি প্রোটোকল ও স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউরের (এসওপি) সরাসরি লঙ্ঘন করে বেআইনিভাবে বহিষ্কারের এই চাঞ্চল্যকর ঘটনায় আসাম সরকারকে বড় অংকের আর্থিক জরিমানা করা হয়েছে। একই সঙ্গে ভুক্তভোগী মমতাজ বেগমকে অবিলম্বে খুঁজে বের করে সসম্মানে ভারতে ফিরিয়ে আনার জন্য দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে সর্বাত্মক উদ্যোগ নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিচারব্যবস্থার ইতিহাসে এই প্রথমবার কোনো ভিনদেশে বেআইনিভাবে পাঠিয়ে দেওয়ার ঘটনায় রাষ্ট্রের ওপর সরাসরি আর্থিক ক্ষতিপূরণ চাপানো হলো।
গত ৩ সেপ্টেম্বর গুয়াহাটি হাইকোর্টের বিশিষ্ট বিচারপতি কল্যাণ রাই সুরানা এবং বিচারপতি সুস্মিতা ফুকন খান্ডের সমন্বয়ে গঠিত একটি সংবেদনশীল ডিভিশন বেঞ্চ এই ঐতিহাসিক রায় প্রদান করেন। ভারতের মর্যাদাপূর্ণ সংবাদমাধ্যম ‘দ্য হিন্দু’-কে উদ্ধৃত করে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ডয়চে ভেলের কন্টেন্ট পার্টনার ‘প্রথম আলো’ এই খবর প্রকাশ করেছে। মমতাজ বেগমের স্বামী মুজাম্মেল হক কর্তৃক দায়ের করা একটি হেবিয়াস কর্পাস বা অবৈধভাবে আটকে রাখার বিরুদ্ধে করা পিটিশনের দীর্ঘ শুনানি শেষে এই রায় ঘোষণা করে আদালত। বিচারকদের সুচিন্তিত পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, আসামের মধ্যাঞ্চলীয় নগাঁওয়ের ফরেনার্স ট্রাইব্যুনাল যেভাবে তাড়াহুড়ো করে গত ৩০ মে মমতাজ বেগমকে ‘বিদেশি’ বলে ঘোষণা করেছিল, তার মধ্যে স্পষ্ট আইনি বিদ্বেষ ও অসৎ অভিসন্ধি লুকিয়ে ছিল।
আদালতের নথি থেকে জানা যায়, এর আগে এই মামলাটি পুনর্বিবেচনার জন্য সংশ্লিষ্ট ট্রাইব্যুনালে ফেরত পাঠানো হয়েছিল, কারণ আদালত মনে করেছিল মমতাজের জমা দেওয়া কোনো প্রমাণই যথাযথভাবে যাচাই করা হয়নি। কিন্তু পুনর্বিবেচনার পর ট্রাইব্যুনালে হাজির হয়ে মমতাজ নিজেকে বিদেশি ঘোষণা করার আদেশ হাতে পেলেও, উচ্চ আদালতে আপিল করার বা আইনি প্রতিকার পাওয়ার ন্যূনতম সুযোগটুকুও তাঁকে দেওয়া হয়নি। আপিল করার আগেই পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করে তড়িঘড়ি বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেয়। গ্রেপ্তারের গোটা প্রক্রিয়া এবং পুলিশ ও ট্রাইব্যুনাল সদস্যদের দেওয়া তথ্যের সত্যতা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে ডিভিশন বেঞ্চ। আদালত স্পষ্টভাবে জানিয়েছে যে, রাষ্ট্রযন্ত্রের এই অশুভ তৎপরতাই মমতাজ বেগমকে তাঁর আইনি অধিকার প্রয়োগ করা থেকে বঞ্চিত করেছে।
এই গুরুতর প্রশাসনিক গাফিলতির জন্য আসাম সরকারকে অবিলম্বে মমতাজ বেগমের স্বামী মুজাম্মেল হককে অন্তর্বর্তীকালীন ক্ষতিপূরণ হিসেবে দুই লাখ রুপি পরিশোধ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আদালত আরও স্পষ্ট করেছে যে, এই ক্ষতিপূরণ পাওয়ার অর্থ এই নয় যে আবেদনকারীর দেওয়ানি আদালতে অতিরিক্ত ক্ষতিপূরণ চাওয়ার আইনি অধিকার চিরতরে খর্ব হয়ে গেল। এছাড়া, গত ৩০ মে ট্রাইব্যুনালের এই বিতর্কিত আদেশটি ঠিক কোন পরিস্থিতিতে এবং কখন প্রস্তুত করা হয়েছিল, তার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করার জন্য আসামের স্বরাষ্ট্র ও রাজনৈতিক বিভাগকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট ট্রাইব্যুনাল সদস্যের ব্যবহৃত কম্পিউটার বা ল্যাপটপ জব্দ করে ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট খতিয়ে দেখার কথাও বলা হয়েছে।
ভবিষ্যতে যাতে এই ধরনের বেআইনি ও স্বেচ্ছাচারী ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে, তার জন্য রাজ্যের সমস্ত জেলা পুলিশ সুপারদের প্রতি কঠোর নির্দেশিকা জারি করেছে উচ্চ আদালত। নির্দেশিকায় বলা হয়েছে যে, কোনো ব্যক্তিকে ঘোষিত বিদেশি নাগরিক হিসেবে হেফাজতে নেওয়ার আগে তাকে অবশ্যই ট্রাইব্যুনালের মূল আদেশ সম্পর্কে বিস্তারিত জানাতে হবে। পাশাপাশি, অভিযুক্ত ব্যক্তিকে জেলা বা নিজ বাসা থেকে অন্য কোথাও সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার আগে তার পরিবারের অন্তত একজন প্রাপ্তবয়স্ক সদস্যকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিষয়টি অবহিত করতে হবে। সবমিলিয়ে, নগাঁওয়ের ফরেনার্স ট্রাইব্যুনালের এই বিতর্কিত ভূমিকার কঠোর সমালোচনা করে আদালত এই মামলায় ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে সরাসরি পক্ষভুক্ত করেছে, যা ভবিষ্যতে দেশের নাগরিকত্ব সংক্রান্ত মামলাগুলিতে একটি বড় আইনি দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।