তিন হাজার কোটি টাকার ব্যবসা করলেই কি ভালো ছবি হয়? ‘ধুরন্ধর’ নিয়ে বিস্ফোরক মন্তব্য তিগমাংশু ধুলিয়ার!

বক্সঅফিসে অভাবনীয় ও বিরাট সাফল্য অর্জন করেছে মেগা হিট সিরিজ ‘ধুরন্ধর’। এই সিরিজের দু’টি ছবি সম্মিলিতভাবে প্রায় ৩০০০ কোটি টাকার রেকর্ড ব্যবসা করেছে। কিন্তু এই বিশাল বাণিজ্যিক সাফল্যের মাঝেই ছবিটির গুণমান ও বিষয়বস্তু নিয়ে তীব্র প্রশ্ন তুললেন বিশিষ্ট ও জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত পরিচালক তিগমাংশু ধুলিয়া। তাঁর সরাসরি দাবি, ‘ধুরন্ধর’ নামক এই বিশাল বাজেটের ছবিটিতে আদতে গল্প বলে কিচ্ছু নেই। শুধু তাই নয়, বলিউডের মূলধারার ছবিতে সঠিক গল্প বলার প্রবণতার চিরতরে মৃত্যু ঘটছে বলেও অত্যন্ত কড়া ভাষায় মন্তব্য করেছেন তিনি।
সম্প্রতি একটি সর্বভারতীয় সংবাদমাধ্যম আয়োজিত জমজমাট অনুষ্ঠান ‘The State of Media and Film Industry’-তে বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন তিগমাংশু ধুলিয়া। সেই মঞ্চ থেকেই আদিত্য ধর পরিচালিত এবং রণবীর সিংহ অভিনীত জনপ্রিয় ছবি ‘ধুরন্ধর’-এর কঠোর সমালোচনা করেন তিনি। নিজের ক্ষোভ প্রকাশ করে পরিচালক বলেন, “কেউ যদি ‘ধুরন্ধরে’র মূল কাহিনি জানতে চান, তিনি তা কাউকেই বোঝাতে পারবেন না। ছবিতে আসলে কী দেখানো হয়েছে? একজন লোক সোজা পাকিস্তানে গিয়ে অবাধে তাণ্ডব চালালো—এটা কি কোনো সুসংহত কাহিনি হতে পারে? আধুনিক বাণিজ্যিক ছবিতে আজ কাহিনির সম্পূর্ণ মৃত্যু ঘটেছে। যাঁরা ভালো গল্প বলতে পারেন, তাঁরা আজ কোণঠাসা এবং শেষ হয়ে গেছেন। আর যাঁরা নতুন গল্প বলতে চান, তাঁদের সেই স্বাধীনতা বা অনুমতিই দেওয়া হয় না। প্রযোজকরা ভেবে বসেন যে ভিন্ন স্বাদের ছবি চলবেন না, তাই তাঁরাও স্রোতের টানে একই গতানুগতিক পথ অনুসরণ করতে বাধ্য হন।”
বলিউডের এই গল্পহীনতা ও সৃজনশীলতার আকালের নেপথ্যে পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থাকে বড়সড় কারণ হিসেবে দায়ী করেছেন তিগমাংশু। তাঁর বিশ্লেষণমূলক কথায়, “পুঁজিবাদের চূড়ান্ত বাড়বাড়ন্ত ঘটলে সমাজের ছবিটা এমনই দাঁড়ায়। তখন চারপাশের সবকিছু দেখতে একরকম লাগে। আজকালকার ফ্যাশনের কথাই ধরুন না কেন, প্রত্যেকেই ঠিক একই রকম ছাঁচে নিজেদের ঢালছেন। চুলের ছাঁট থেকে শুরু করে স্টাইল—সব এক। এমনকি আমাদের দেশের ঐতিহাসিক শহরগুলোকে পর্যন্ত এখন হুবহু একইরকম দেখতে লাগে। অতীতে প্রতিটি শহরের নিজস্ব একটি স্বতন্ত্র চরিত্র ও ইতিহাস থাকত, যা আজ পুরোপুরি হারিয়ে গেছে। আমার নিজের শহর এলাহাবাদ অতীতে বহু সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের জন্য বিশ্বজুড়ে পরিচিত ছিল। অথচ বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে সেটিও অন্য দশটা সাধারণ শহরের মতোই একঘেয়ে লাগে। সর্বত্র একই রকমের চকচকে শপিং মল আর একই ব্র্যান্ডের গাড়ি। এই ধরনের একমুখী বাণিজ্যিক রাজনৈতিক ব্যবস্থা মানুষের নিজস্ব স্বকীয়তা ও মৌলিকতাকে চিরতরে ধ্বংস করে দেয়।”
উল্লেখ্য, পরিচালক তিগমাংশু ধুলিয়ার চলচ্চিত্র নির্মাণশৈলী বরাবরই দর্শক ও সমালোচকদের কাছে উচ্চ আদৃত ও সমাদৃত হয়েছে। বিশেষ করে প্রয়াত কিংবদন্তি অভিনেতা ইরফান খানের সঙ্গে তাঁর যৌথ কাজগুলি—সে ‘হাসিল’ হোক কিংবা কালজয়ী ‘পান সিং তোমর’—চলচ্চিত্রের ইতিহাসে অসম্ভব প্রশংসা ও জাতীয় পুরস্কার কুড়িয়েছে। খুব শীঘ্রই মুক্তি পেতে চলেছে তিগমাংশুর নতুন ছবি ‘ঘমাসান’, যেখানে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করতে দেখা যাবে প্রতিভাবান অভিনেতা আরশাদ ওয়ার্সি ও প্রতীক গাঁধীকে। তবে মেগা ব্লকবাসস্টার ‘ধুরন্ধর’ নিয়ে তাঁর এই ধরনের সরাসরি সমালোচনা একেবারেই ভালো চোখে নেননি অনেকে। সোশ্যাল মিডিয়ায় তাঁর এই মন্তব্যকে ঘিরে শুরু হয়েছে তীব্র তরজা। অনেকেই তিগমাংশুর এই আক্রমণকে নিছক ‘আঙুর ফল টক’ তত্ত্বের সঙ্গে তুলনা করে তাঁকে জোরালো কটাক্ষও করেছেন।
প্রসঙ্গত, বক্সঅফিসে ইতিহাস সৃষ্টিকারী ‘ধুরন্ধর’ ছবিটির পরিচালক হলেন স্বনামধন্য আদিত্য ধর। ছবিতে মুখ্য চরিত্রে অনবদ্য অভিনয় করেছেন সুপারস্টার রণবীর সিংহ। এছাড়াও গুরুত্বপূর্ণ ও শক্তিশালী চরিত্রে দেখা গেছে অক্ষয় খন্না, সঞ্জয় দত্ত, অর্জুন রামপাল, আর মাধবন, সারা অর্জুন, রাকেশ বেদী এবং গৌরব গেরা-র মতো জনপ্রিয় তারকাদের। ছবিতে রণবীর সিংহ একজন নির্ভীক ভারতীয় গুপ্তচরের চরিত্রে অভিনয় করেছেন, যিনি শত্রুদেশের হৃদয়ে ঢুকে ভারতবিরোধী সমস্ত সন্ত্রাসী শক্তিকে চরমভাবে দুরমুশ করেন। এই ছবিটির দু’টি পার্ট মিলিয়ে বিশ্বব্যাপী বক্সঅফিসে প্রায় ৩০০০ কোটি টাকার অবিশ্বাস্য ব্যবসা করেছে।