দেড় হাজার মৃত্যুর শোকের মাঝেই নতুন বিপর্যয়! রিখটার স্কেলে ৫.৩ মাত্রার তীব্র কম্পনে কাঁপল মুস্তাং!

প্রাকৃতিক দুর্যোগের ভয়াবহ গ্রাসে এমনিতেই চরমভাবে বিধ্বস্ত ও বিপর্যস্ত নেপাল। হড়পা বানের ক্ষত এখনও পুরোপুরি শুকায়নি, তার মধ্যেই এবার হিমালয়ের কোলে অবস্থিত এই ছোট্ট পাহাড়ি দেশে আঘাত হানল নতুন এক প্রলয়ঙ্করী ভূমিকম্প। জাতীয় সিসমোলজি সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার স্থানীয় সময় রাত ৯টা বেজে ৫৩ মিনিটে সংঘটিত এই ভূমিকম্পে রিখটার স্কেলে কম্পনের মাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৫.৩। প্রশাসনের প্রাথমিক প্রতিবেদন থেকে জানা গিয়েছে যে, এই শক্তিশালী ভূমিকম্পের কেন্দ্রস্থল ছিল নেপালের মুস্তাং জেলার দুর্গম লোমানথাং এলাকা, যা দেশের রাজধানী কাঠমান্ডু থেকে আনুমানিক ৩৭৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। উত্তর এবং মধ্য-পশ্চিম নেপালের যে সমস্ত অঞ্চলগুলি সম্প্রতি বিধ্বংসী হড়পা বানের কারণে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, এই ভূমিকম্পের উৎসস্থল সেখান থেকে প্রায় ২৫০ কিলোমিটারের কিছুটা দূরে অবস্থিত বলে চিহ্নিত করা হয়েছে।
গত ২৬ আগস্টের ভয়াবহ দিনটি নেপালের আধুনিক ইতিহাসে এক চিরকালীন কালো দিন হিসেবে খোদাই হয়ে থাকবে। সেই অভিশপ্ত দিনের ভয়াবহ হড়পা বানের তীব্র তাণ্ডবে প্রায় দেড় হাজার সাধারণ মানুষের মৃত্যুর মর্মান্তিক খবর আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছে দেশটির প্রশাসন। শুধু প্রাণহানিই নয়, এখনও পর্যন্ত নিখোঁজ রয়েছেন ৫ হাজারের বেশি মানুষ, যার মধ্যে বেশ কয়েকজন ভারতীয় নাগরিকও অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এমন এক নজিরবিহীন মানবিক বিপর্যয়ের ঠিক মাঝেই হিমাঞ্চলে এই নতুন ভূমিকম্পের আঘাত পরিস্থিতিকে আরও জটিল ও আতঙ্কজনক করে তুলেছে। তবে মঙ্গলবার গভীর রাত পর্যন্ত এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত সময়ে নেপালের ভূমিকম্পের জেরে নতুন করে কোনো বড় ধরনের প্রাণহানি বা ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির সুনির্দিষ্ট খবর পাওয়া যায়নি। বিভিন্ন ক্ষতিগ্রস্ত ও সংবেদনশীল এলাকায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে দ্রুত খোঁজখবর নেওয়া শুরু হয়েছে এবং সামগ্রিক পরিস্থিতি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখার জন্য বিশেষ উদ্ধারকারী দল পাঠানো হয়েছে। স্বস্তির বিষয় হলো, এই ভূমিকম্পের পর এখনও পর্যন্ত কোনো শক্তিশালী আফটার শকের খবর সামনে আসেনি।
উল্লেখ্য, হড়পা বানে কার্যত সর্বস্ব হারিয়ে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া নেপালে এখনও পুরোদমে যুদ্ধকালীন তৎপরতায় উদ্ধারকার্য চালিয়ে যাচ্ছেন সেনাকর্মী ও উদ্ধারকারীরা। নতুন করে ঘটে যাওয়া এই ভূমিকম্পের ফলে সেই উদ্ধারকাজ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ার তীব্র আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। যদিও গবেষকদের মতে, হড়পা বান হানা দেওয়ার মূল অঞ্চল থেকে ভূমিকম্পের কেন্দ্রস্থল কিছুটা দূরে অবস্থিত, তবুও পাহাড়ি এলাকার ভঙ্গুর ভূপ্রকৃতি বাড়তি উদ্বেগ তৈরি করছে। বিজ্ঞানীদের প্রাথমিক অনুমান অনুযায়ী, নেপালে সাম্প্রতিক এই ভয়াবহ হড়পা বানের মূল কারণ ছিল সুউচ্চ হিমবাহ ধস বা বিশাল বরফের চাঁই হড়কে যাওয়া। সম্ভবত নেপাল-তিব্বত সীমান্তের (চিনের অংশ সংলগ্ন) রাসুয়াগঢ়ীর উত্তর-পূর্বে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত কোনো জমাট বাঁধা হিমবাহের সুবৃহৎ লেক ফেটে গিয়েই (গ্লেসিয়াল লেক আউটবার্স্ট ফ্লাড বা GLOF) এই প্রলয় ডেকে এনেছে।
তদন্তে আরও প্রকাশ পেয়েছে যে, সেই ভয়াবহ হড়পা বানের জলরাশির ঢেউ কিছু কিছু এলাকায় ৮ থেকে ১০ মিটার পর্যন্ত উঁচুতে উঠেছিল। মাত্র আধ ঘণ্টার ব্যবধানে ত্রিশূলীর মালেখুতে সেই জলস্ফীতির ঢেউ ছিল ৭ মিটার এবং গালচিতে তার উচ্চতা পৌঁছেছিল ৯ মিটার পর্যন্ত। এই দানবাকৃতি ধ্বংসাত্মক ঢেউয়ের তোড়ে তিমুর, রাসুয়াগঢ়ীর বিভিন্ন জনবসতিপূর্ণ এলাকা, সায়াপ্রুবেশির অংশবিশেষ, মেলাং, শান্তিবাজার এবং ঐতিহাসিক বেত্রাবতীর যাতায়াতের পথে যা কিছু সামনে এসেছে, তার সবকিছুই চোখের পলকে ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে গিয়েছে। এই সর্বনাশা হড়পা বানে প্রায় ১২টি জলবিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র (যার সম্মিলিত ক্ষমতা প্রায় ৪৩১.১ মেগাওয়াট) বর্তমানে বিদ্যুৎ গ্রিড থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। পাশাপাশি, যোগাযোগ ব্যবস্থার লাইফলাইন হিসেবে পরিচিত বহু গুরুত্বপূর্ণ সেতু এবং পাকা রাস্তা স্রেফ ধূলিসাৎ হয়ে গিয়েছে। উদ্ধারকারী দলগুলি যত গভীরে পৌঁছাচ্ছে, এই সর্বগ্রাসী বিপর্যয়ের ক্ষয়ক্ষতির আসল পরিমাণ ততটাই ভয়াবহভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে।