বেসরকারি শরিয়ত আদালত কি স্বামী-স্ত্রীর বিবাহবিচ্ছেদ ঘটাতে পারে? বড় রায় দিল ছত্তিশগড় হাইকোর্ট

শরিয়ত আদালত হিসেবে কার্যকর কোনো বেসরকারি ধর্মীয় সংস্থার বিবাহবিচ্ছেদ মঞ্জুর করার বা বৈবাহিক অধিকার নির্ধারণ করার কোনো আইনি এক্তিয়ার নেই। অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এক রায়ে এই স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছে ছত্তিশগড় হাইকোর্ট। আদালত রায়পুরের একটি শরিয়ত আদালতের জারি করা সেই বিতর্কিত আদেশটি সম্পূর্ণ বাতিল করেছে, যে আদেশে এক মহিলাকে তাঁর স্বামীর কাছ থেকে বিবাহবিচ্ছেদপ্রাপ্ত বলে ঘোষণা করা হয়েছিল। ছত্তিশগড় হাইকোর্টের দ্ব্যর্থহীন পর্যবেক্ষণ, এ ধরনের বেসরকারি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান সাধারণ মানুষের ধর্মীয় মতামত বা ফতোয়া দিতে পারে ঠিকই, কিন্তু তারা কোনোভাবেই আইনি এক্তিয়ার প্রয়োগ করে বৈবাহিক অধিকার নির্ধারণ বা বাধ্যতামূলক আদেশের মাধ্যমে বিবাহবিচ্ছেদ ঘটাতে পারে না।

এই আইনি লড়াইয়ের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ৩৮ বছর বয়সী নিরোশ আব্বাসি। তাঁর প্রথম স্বামী ২০১৫ সালে মারা যাওয়ার পর, তিনি ২০২২ সালে মহম্মদ আবিদ খানকে দ্বিতীয়বার বিয়ে করেন। পরবর্তীতে নতুন পরিবারে সন্তানদের মানিয়ে নেওয়া ও পারিবারিক নানা বিষয় নিয়ে দম্পতির মধ্যে চরম বিরোধ দেখা দেয়। আব্বাসির অভিযোগ অনুসারে, এরপর তাঁর স্বামী একতরফাভাবে বিবাহবিচ্ছেদের আইনি প্রক্রিয়া শুরু করেন। তিনি জানান, তাঁর স্বামী ২০২১ সালের ৩১ আগস্ট, ৩০ সেপ্টেম্বর এবং ৩০ অক্টোবর পাঠানো বিভিন্ন বার্তার মাধ্যমে তাঁকে একসঙ্গে ‘তিন তালাক’ দেন।

এর পাশাপাশি, আব্বাসি তাঁর স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির লোকজনের বিরুদ্ধে বাড়িতে হয়রানি, মানসিক নিষ্ঠুরতা ও শারীরিক নির্যাতনের গুরুতর অভিযোগ আনেন। উভয় পক্ষের মধ্যে পারিবারিক কাউন্সেলিং বা আলোচনার মাধ্যমেও এই বৈবাহিক বিরোধের কোনো সমাধান করা সম্ভব হয়নি। ফলে চরম বিরক্ত ও অসহায় হয়ে আব্বাসি ২০২১ সালের ৭ অক্টোবর সুনির্দিষ্ট অভিযোগ দায়ের করেন, যার ভিত্তিতে ১ নভেম্বর একটি এফআইআর নথিভুক্ত করা হয়।

এই পারিবারিক বিরোধ চলাকালীনই, ২০২২ সালের ১৮ জানুয়ারি রায়পুরের একটি শরিয়ত আদালত তড়িঘড়ি করে একটি আদেশ জারি করে আব্বাসিকে তাঁর স্বামীর কাছ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিবাহবিচ্ছেদপ্রাপ্ত বলে ঘোষণা করে। ব্যক্তিগত আইন ও আইনি এক্তিয়ারের সীমানা লঙ্ঘন করায় বিষয়টি শেষ পর্যন্ত গড়ায় ছত্তিশগড় হাইকোর্টে। মামলাটি হাইকোর্টের সামনে বিচারাধীন এলে বিচারপতি অমিতেন্দ্র কিশোর প্রসাদ শরিয়ত সংস্থাটির জারিকৃত সেই আদেশ বাতিল বলে ঘোষণা করেন। উচ্চ আদালতের সুস্পষ্ট পর্যবেক্ষণ ছিল যে, ‘দারুল কাজা’-র মতো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো মূলত ফতোয়া বা ধর্মীয় মতামত প্রদান করে থাকে, কিন্তু রাষ্ট্রীয় আইনে সেগুলোর কোনো আইনগত অনুমোদন বা কার্যকারিতা নেই।

আদালত আরও জানায় যে, এ ধরনের সংস্থাগুলো কেবল ধর্মীয় মতামত বা পরামর্শ প্রকাশ করতে পারে, কিন্তু তাদের মতামত কোনো ব্যক্তির সাংবিধানিক আইনি অধিকার, বৈবাহিক মর্যাদা বা আইনি দায়বদ্ধতাকে বাধ্যতামূলকভাবে পরিবর্তন করতে পারে না। তবে হাইকোর্ট এই নির্দিষ্ট মামলায় বিবাহবিচ্ছেদের সামগ্রিক সাংবিধানিক বৈধতা নিয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানায়নি। এর পরিবর্তে, আদালত তার রায়কে কেবল ওই বেসরকারি ধর্মীয় সংস্থার ক্ষমতার এক্তিয়ারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রেখেছে এবং অত্যন্ত স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, বিবাহবিচ্ছেদ এবং বৈবাহিক অধিকারের যথাযথ আইনি নিষ্পত্তি কেবল দেশের উপযুক্ত বিচারব্যবস্থা বা আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই সম্পন্ন করা সম্ভব।