রেড রোডের কার্নিভাল বাতিল থেকে শুরু করে ১ লক্ষ টাকার অনুদান! শুভেন্দু অধিকারীর জমানায় দুর্গাপুজোয় এ কোন মহা বদল?

পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ইতিহাসে ২০২৬ সালের শারদোৎসব এক যুগান্তকারী ও ঐতিহাসিক পরিবর্তনের সাক্ষী হতে চলেছে। দীর্ঘ দেড় দশক ধরে তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জমানায় দুর্গাপূজা যেভাবে জাঁকজমকপূর্ণভাবে পরিচালিত হয়েছে, বর্তমান বিজেপি সরকারের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নতুন নিয়মাবলীর জেরে তাতে এসেছে এক আমূল রূপান্তর। সনাতনী শাস্ত্রীয় অনুশাসন ও প্রশাসনিক কড়াকড়ির মিশ্রণে বাংলার সর্বশ্রেষ্ঠ উৎসবের রূপ ও রঙে এক বিশাল ফারাক লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
তৃণমূল জমানার দুর্গাপূজার মূল উদ্দেশ্যই ছিল উৎসবের দিনকে যতটা সম্ভব বাড়িয়ে দেওয়া। মহালয়া আসার আগেই, পিতৃপক্ষ চলাকালীনই বহু বড় মণ্ডপের উদ্বোধন হয়ে যেত। সমালোচকদের মতে এটি শাস্ত্রীয় নিয়মের পরিপন্থী হলেও, সাধারণ মানুষের মণ্ডপ দর্শনের সময় বাড়াতে এটি দারুণ কাজ করেছিল। অন্যদিকে, বর্তমান শুভেন্দু অধিকারীর সরকার ক্ষমতায় এসেই পূজা উদ্বোধনের ক্ষেত্রে “সনাতন ঐতিহ্য ও শাস্ত্রীয় নিয়ম” ফিরিয়ে আনার ওপর জোর দিয়েছে। স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, দেবীপক্ষের সূচনা তথা মহালয়া না হলে কোনো মণ্ডপ সাধারণের জন্য খোলা যাবে না।
আর্থিক অনুদানের ক্ষেত্রেও এসেছে বড়সড় বদল। বিগত দিনে হাজার হাজার পূজা কমিটিকে দেদার সরকারি অনুদান দেওয়া হলেও, বর্তমান সরকার এই খয়রাতি প্রথায় রাশ টেনে অনুদানের অঙ্ক কমিয়ে ১ লক্ষ টাকা করেছে। সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হলো—মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বড় এবং কর্পোরেট স্পন্সর পাওয়া পূজা কমিটিগুলোকে সরকারি অনুদান না নেওয়ার অনুরোধ করেছেন, যাতে সেই টাকা সত্যিই পিছিয়ে পড়া ও ছোট পূজা কমিটিগুলোর উন্নয়নে ব্যবহার করা যায়। ইউনেস্কোর হেরিটেজ তকমা পাওয়ার পর কলকাতার রেড রোডের ‘দুর্গাপূজা কার্নিভাল’ ছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্বপ্নের প্রোজেক্ট। কিন্তু বর্তমান সরকার এই কার্নিভালকে অপচয় ও অপ্রয়োজনীয় আখ্যা দিয়ে ২০২৬ সালে তা পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়েছে। উৎসবের জাঁকজমককে এবার বিসর্জন থেকে সরিয়ে এনে আবাহনে যুক্ত করা হয়েছে—মহালয়ার দিন কলকাতার ঐতিহ্যবাহী ইডেন গার্ডেন্সে ড্রোন প্রদর্শনী এবং লাইট-সাউন্ড শো-এর মাধ্যমে সরকারিভাবে উৎসবের সূচনা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সামাজিক শৃঙ্খলা ও ধর্মীয় পবিত্রতা রক্ষায় বর্তমান সরকার অত্যন্ত কঠোর অবস্থান নিয়েছে। অঞ্জলি ও উৎসবের মূল দিন অর্থাৎ মহাঅষ্টমীতে রাজ্যজুড়ে সম্পূর্ণ মদ বিক্রি নিষিদ্ধ অর্থাৎ ড্রাই ডে ঘোষণা করা হয়েছে, যা বাংলায় এই প্রথম। একই সাথে মণ্ডপে ও বিসর্জনের শোভাযাত্রায় তারস্বরে ডিজে বাজানোর ওপর সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা চাপানো হয়েছে যাতে সাধারণ মানুষ ও রোগীদের ভোগান্তি না হয়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আমলে বাংলার দুর্গাপূজা পেয়েছিল একটি উন্মুক্ত ও বিশ্বজনীন থিম-কার্নিভালের রূপ, যেখানে ধর্মীয় আচারের চেয়ে উৎসবের আনন্দই ছিল মুখ্য। অপরদিকে, ২০২৬ সালে শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন নতুন প্রশাসন দুর্গাপূজাকে তার বিশুদ্ধ সনাতনী শিকড়ে, শাস্ত্রীয় গাম্ভীর্যে এবং কঠোর সামাজিক অনুশাসনে বেঁধে ফেলতে চাইছে।