দুর্গাপুজোয় আমিষ খাওয়া নিয়ে চরম বিতর্ক! বাগেশ্বর বাবার বিতর্কিত মন্তব্যকে একহাত নিলেন শমীক-অগ্নিমিত্রারা

বাঙালির কাছে দুর্গাপুজো মানেই কেবল প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে ঘুরে প্রতিমা দর্শন নয়, বরং সারাবছর ধরে জমানো উৎসাহে ফুচকা, এগরোল, চিকেন চাউমিন কিংবা বিজয়া দশমীর কোলাকুলি থেকে শুরু করে চুটিয়ে ভোজনরসিকতার এক অনন্য উৎসব। কিন্তু সম্প্রতি এই সার্বজনীন উৎসবের খাবার-দাবার নিয়ে এক বিতর্কিত মন্তব্য করে বসেছেন মধ্যপ্রদেশের স্বঘোষিত ধর্মগুরু ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ শাস্ত্রী, যিনি ‘বাগেশ্বর বাবা’ নামেই সর্বাধিক পরিচিত। তিনি দাবি করেছেন যে, দুর্গাপুজোর প্যান্ডেলের পেছনে নাকি অস্বাস্থ্যকর ও নোংরা খাবার তৈরি করা হয়। আর এই মন্তব্য প্রকাশ্যে আসতেই শুরু হয়ে গেছে তীব্র রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্ক। প্রশ্ন উঠেছে—যে বাঙালি যুগ যুগ ধরে নিজস্ব সংস্কৃতি ও নিয়ম-আচার মেনে ভক্তিভরে দুর্গাপুজো উদযাপন করে আসছে, তাদের খাদ্যাভ্যাস নিয়ে আঙুল তোলার অধিকার ভিন রাজ্যের এক ধর্মগুরুর কে দিল?
আশ্চর্যের বিষয় হলো, বাগেশ্বর বাবার এই বিতর্কিত মন্তব্যের পর খোদ বিজেপির অন্দরেই প্রবল মতপার্থক্য ও অসন্তোষ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। দলের রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় আক্রমণ শানিয়ে বলেছেন, “নবমীর দিন বাঙালি সাধারণত পাঁঠার মাংস খায়। অষ্টমীর দিন লুচি খায়। তো সেটাই খাবে। আপনি আপনার বাড়িতে কী খাবেন, তা কি কোনো সাধু বা ভিন রাজ্যের লোক নির্ধারণ করে দেবে?” তিনি আরও জোরালোভাবে স্মরণ করিয়ে দেন যে, স্বামী বিবেকানন্দ পর্যন্ত বলে গেছেন এবং আমাদের এই ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতির ওপর আর কেউ নেই। বাঙালি যেভাবে যুগ যুগ ধরে মা কালীর পুজোয় আমিষ ভোগ বা বলিদান প্রথা মেনে আসছে, তাতে অন্য কারও হস্তক্ষেপ বরদাস্ত করা হবে না।
প্রায় একই সুরে সুর মিলিয়ে ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন বিজেপি নেত্রী ও বিধায়ক অগ্নিমিত্রা পাল। তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে, বাঙালির দুর্গাপুজো এবং ভিন রাজ্যের নবরাত্রি সম্পূর্ণ আলাদা দুটি বিষয়। তাই পুজোর ক’দিন বাঙালি কী খাবে, কী পোশাক পরবে, কখন বাইরে বেরোবে আর কখন বাড়ি ফিরবে—তা কোনো ভিন রাজ্যের মানুষ বা অন্য কেউ এসে নির্দেশ দিয়ে বলে দিতে পারে না। অগ্নিমিত্রা পাল আরও বলেন, “আমার মনে হয় বাইরের কেউ এসে এখানকার আসল সংস্কৃতিটা বুঝতে পারবে না। অন্য রাজ্যে এই দশ দিন হয়তো সবাই মিলে নিরামিষ খান, কিন্তু আমাদের সংস্কৃতি সম্পূর্ণ আলাদা। আমরা সারা বছর ধরে কষ্ট করে টাকা জমাই যাতে পুজোর চারটা দিন রেস্তোরাঁয় গিয়ে কব্জি ডুবিয়ে মাটন বা ইলিশ মাছ খেতে পারি। তাই রাজ্যে রাজ্যে সংস্কৃতির এই ফারাকটা বুঝতে হবে।”
পাশাপাশি তিনি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত আক্রমণকারীদের সতর্ক করে দিয়ে মন্তব্য করেন যে, এই ইস্যুকে কেন্দ্র করে কেউ যেন রাজনীতির আগুনে ফায়দা তোলার বা রুটি সেঁকার চেষ্টা না করেন। যারা রাজনীতির ময়দানে ফায়দা লুটতে চান, তাঁদের এই ধরনের প্ররোচনামূলক মন্তব্য বন্ধ করা উচিত। শমীক ভট্টাচার্য ও অগ্নিমিত্রা পালের এই প্রকাশ্য অবস্থান থেকেই পরিষ্কার যে, ভিন রাজ্যের ধর্মীয় ব্যক্তিত্বের মন্তব্যকে রাজ্য বিজেপি নেতৃত্ব কোনোভাবেই সমর্থন করছে না। বরং বাঙালির নিজস্ব খাদ্যাভ্যাস, ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতির স্বাধীনতার পক্ষে দাঁড়িয়ে তারা নিজেদের অবস্থান অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে স্পষ্ট করে দিয়েছেন।