“পুজোয় বাঙালি কী খাবে তা কি মধ্যপ্রদেশের বাবা ঠিক করবেন?” ধীরেন্দ্র শাস্ত্রীর মন্তব্যে রাজ্যজুড়ে চরম তোলপাড়

রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দের পদধূলিধন্য বাংলায় পা রেখে সম্প্রতি এক বিস্ফোরক মন্তব্য করে চরম বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন মধ্যপ্রদেশের বাগেশ্বরধামের ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ শাস্ত্রী। তিনি প্রকাশ্যে ঘোষণা করেছেন, “দুর্গাপুজোর সময়ে যাঁরা আমিষ খান, তাঁরা ভণ্ড।” এই মন্তব্য প্রকাশ্যে আসার সঙ্গে সঙ্গেই রাজ্যজুড়ে প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে। প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে, যুগ যুগ ধরে নিজস্ব রীতি-রেওয়াজ ও আনন্দ-উৎসবে মেতে ওঠা বাঙালিকে খাদ্যাভ্যাস নিয়ে ফতোয়া দেওয়ার অধিকার এই ভিনরাজ্যের বাবার কে দিল? এই স্পর্শকাতর ও উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে সোচ্চার হয়েছেন সনাতন ধর্মের বিশিষ্ট ব্যাখ্যাকর্তা স্বামী পরমাত্মানন্দ মহারাজ।

ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ শাস্ত্রীর এই মন্তব্যের তীব্র সমালোচনা করে পরমাত্মানন্দ মহারাজ একে তাঁর “অল্প বয়সের প্রগলভতা ও রাজনৈতিক প্রশ্রয়প্রাপ্ত বাচালতা” বলে উল্লেখ করেছেন। অত্যন্ত ক্ষোভের সুরে তিনি বলেন, “যিনি নিজের বোনকে হিন্দু ধর্মে আটকে রাখতে পারেন না, যিনি নিজের ভাইকে নীতিশিক্ষা দিতে ব্যর্থ হন এবং নারী নির্যাতনের অভিযোগে যাঁকে জেল খাটতে হয় কিংবা কৃষকদের জমি জবরদখল করে হনুমানজির মন্দির গড়ার চেষ্টা করেন—তাঁর মুখে এহেন কথা মানায় না। তাঁর কাছ থেকে আমাদের সার্টিফিকেট নিতে হবে না কে হিন্দু থাকবে আর কে থাকবে না।”

তিনি আরও বলেন, “অল্প বয়সের আস্ফালন কখনও কখনও সহ্য করা যায়, কিন্তু যখন সেই বাচালতা ধর্মের আড়ালে এসে সাধারণ মানুষের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে আক্রমণ করে, তখন সনাতন ভারতবর্ষ তা কখনই বরদাস্ত করে না। একে অভদ্রতা ও বর্বরতা ছাড়া আর কিছুই বলা চলে না।” বাগেশ্বরবাবুকে তীব্র কটাক্ষ করে তিনি বলেন, “নবরাত্রির আচার আর বাংলার দুর্গোৎসবের আকাশ-পাতাল তফাত রয়েছে। বাংলার দুর্গোৎসব কেবল একটি পুজো নয়, এটি আদ্যোপান্ত একটি বহুস্তরীয় প্রাচীন পরম্পরা ও সামাজিক উৎসব।”

বাঙালির দুর্গোৎসবের ইতিহাস তুলে ধরে মহারাজ জানান, এর মধ্যে বৈদিক, পৌরাণিক, তান্ত্রিক এবং অন্ত্যজ ও লোকসংস্কৃতির নানা ধারা ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে। নবমীর বলিদানের পর শবরোৎসবের মতো প্রাচীন লোকচার আজও বাংলার সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। এই আবহমান সংস্কৃতিকে না বুঝেই ভিনরাজ্যের এক ধর্মগুরুর এহেন মন্তব্য বাংলার কৃষ্টির অপমান বলে মনে করছেন সচেতন নাগরিকরা। পুজোয় আমিষ বা নিরামিষ ভক্ষণের মতো ব্যক্তিগত বিষয়ে ফতোয়া না দিয়ে বাংলার ঐতিহ্যকে সম্মান জানানোর দাবি তুলেছে বিভিন্ন মহল।