“আমরা ভুলিনি, ভুলব না!” মুজাফফরনগর দাঙ্গার বার্ষিকীতে কোন রহস্যময় পোস্টার ঘিরে তোলপাড় রাজ্য?

উত্তরপ্রদেশের মুজাফফরনগর দাঙ্গার ত্রয়োদশ বার্ষিকীতে রাজ্যের চারটি প্রধান শহরে টাঙানো কিছু বিতর্কিত পোস্টার ও হোর্ডিংকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র চাঞ্চল্য ও উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছে। লখনউ, মুজাফফরনগর, শামলি এবং সাহারানপুরের বিভিন্ন ব্যস্ত রাস্তার মোড়ে ও জনবহুল এলাকায় এই পোস্টারগুলো রাতের অন্ধকারে সাঁটানো হয়েছিল। বিশেষ করে মুজাফফরনগরের সংবেদনশীল সিভিল লাইন্স থানা এলাকার বেশ কিছু জায়গায় এই হোর্ডিংগুলো দেখতে পাওয়া যায়। চাঞ্চল্যকর বিষয় হল, ওই বিতর্কিত পোস্টারগুলোতে বড় বড় অক্ষরে লেখা ছিল, “আমরা ভুলিনি, আমরা ভুলিনি, আমরা ভুলব না।” শুধু তাই নয়, দাঙ্গার স্মৃতি উসকে দেওয়া এই পোস্টারগুলোতে সমাজবাদী পার্টির (এসপি) প্রধান ও রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী অখিলেশ যাদবের ছবিও স্পষ্টভাবে মুদ্রিত ছিল। স্থানীয় সূত্রে খবর পাওয়ার পরেই নড়েচড়ে বসে পুলিশ প্রশাসন এবং দ্রুত পদক্ষেপ করে হোর্ডিংগুলো সরিয়ে ফেলা হয়। বর্তমানে কারা এবং ঠিক কী অভিসন্ধি নিয়ে এই পোস্টারগুলো টাঙিয়েছিল, তা খুঁজে বের করতে পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সকালে ঘুম ভেঙে সাধারণ মানুষ রাস্তায় বের হয়ে এই পোস্টারগুলো দেখতে পেতেই গোটা এলাকায় আলোচনার ঝড় ওঠে। ২০১৩ সালের ভয়াবহ দাঙ্গার স্মৃতি ও ক্ষতগুলোকে নতুন করে জাগিয়ে তোলার মতো এই বার্তার সঙ্গে সমাজবাদী পার্টি সুপ্রিমো অখিলেশ যাদবের ছবি যুক্ত থাকায় বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক তরজা বহুগুণ বেড়ে গেছে। কে বা কারা কিংবা কোন রাজনৈতিক বা অরাজনৈতিক সংস্থা এই পোস্টারগুলো রাতের অন্ধকারে সাঁটিয়েছিল, তা এখনও পর্যন্ত সম্পূর্ণ অস্পষ্ট। পুলিশের প্রাথমিক অনুমান, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটাতেই ইচ্ছাকৃতভাবে এই ধরনের প্ররোচনামূলক পদক্ষেপ করা হয়ে থাকতে পারে।
এই প্রসঙ্গে মুখ খুলেছেন প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্তারা। মুজাফফরনগরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (এএসপি) সিদ্ধার্থ কে. মিশ্র সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে, সিভিল লাইন্স থানা এলাকার নির্দিষ্ট কিছু জায়গায় দাঙ্গা-সংক্রান্ত ও আপত্তিকর বিষয়বস্তু সম্বলিত কিছু হোর্ডিং বা পোস্টার পাওয়ার খবরের সত্যতা মিলেছে। খবর পাওয়া মাত্রই পুলিশি টিম দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে সমস্ত পোস্টার ও হোর্ডিং নামিয়ে ফেলে। তিনি আরও স্পষ্ট করে জানান যে, এই পোস্টারগুলো কারা লাগিয়েছিল সেই বিষয়ে জোরকদমে তদন্ত চলছে এবং তদন্তে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে আইন অনুযায়ী কঠোর পদক্ষেপ করা হবে। এএসপি-র মতে, বার্ষিকীর দিনটিতে যে কেউ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এই ধরনের পোস্টার টাঙানোর অপচেষ্টা চালিয়ে থাকতে পারে, কিন্তু সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দৃষ্টিকোণ থেকে এগুলির বিষয়বস্তু অত্যন্ত আপত্তিকর ও প্ররোচনামূলক ছিল। সেই কারণেই তাৎক্ষণিকভাবে পুলিশি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
উল্লেখ্য, ৭ই সেপ্টেম্বর তারিখটি উত্তরপ্রদেশের ইতিহাসে অত্যন্ত কালো এবং বেদনাদায়ক একটি অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত, যা ২০১৩ সালের মুজাফফরনগর সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সঙ্গে সরাসরি জড়িত। ২০১৩ সালের ২৭শে আগস্ট জানসাথ এলাকার কাওয়াল গ্রামে শাহনাওয়াজ নামক এক যুবককে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। এর ঠিক পরেই তার চাচাতো ভাই শচীন ও গৌরবকেও খুন করার খবর ছড়িয়ে পড়ে, যার জেরে গোটা জেলায় তীব্র উত্তেজনা ছড়াতে শুরু করে। এরপর ওই বছরেরই ৭ই সেপ্টেম্বর নাগলা মান্দৌর এলাকায় আয়োজিত একটি বিশাল মহাপঞ্চায়েত থেকে ফেরার পথে সাধারণ মানুষের ওপর রক্তক্ষয়ী হামলার ঘটনা ঘটে। এই ঘটনার পরেই পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি ঘটে, গোটা জেলাজুড়ে হিংসা দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে এবং ভয়াবহ দাঙ্গা শুরু হয়। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, সেই মর্মান্তিক দাঙ্গায় সর্বমোট ৬৫ জন মানুষের প্রাণহানি ঘটেছিল। ত্রয়োদশ বার্ষিকীর ঠিক প্রাক্কালে সেই দাঙ্গার স্মৃতিবাহী পোস্টার ঘিরে ফের পারদ চড়ছে উত্তরপ্রদেশ রাজনীতিতে।