বিনা কারণে রোগী রেফার আর নয়! সরকারি হাসপাতালের সিসিইউ নিয়ে স্বাস্থ্য ভবনের কড়া পদক্ষেপে চাঞ্চল্য

সরকারি হাসপাতালের ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট (ICU) এবং ক্রিটিক্যাল কেয়ার ইউনিট (CCU) পরিষেবা নিয়ে একের পর এক গুরুতর অভিযোগ জমা পড়ার পর এবার নড়েচড়ে বসল স্বাস্থ্য ভবন। সম্প্রতি স্বাস্থ্য ভবনের প্রকাশিত একটি উচ্চপর্যায়ের পারফরম্যান্স রিপোর্টে রাজ্যের একাধিক নামী ও গুরুত্বপূর্ণ মেডিক্যাল কলেজের কার্যকারিতা নিয়ে চরম অসন্তোষ প্রকাশ করা হয়েছে। প্রকাশিত এই কালো তালিকায় কলকাতার একাধিক হেভিওয়েট প্রতিষ্ঠান যেমন কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ, ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজ এবং বারাসাত মেডিক্যাল কলেজ ছাড়াও উত্তরবঙ্গ মেডিক্যাল কলেজ, কোচবিহার এমজেএন মেডিক্যাল কলেজ এবং ঝাড়গ্রাম মেডিক্যাল কলেজের নাম উঠে এসেছে। বিশেষ করে অতিরিক্ত মাত্রায় রোগী রেফার করার প্রবণতা এবং পরিকাঠামোগত অব্যবস্থাপনার জেরে রাজ্যের ১০টি জেলার মোট ১৫টি সরকারি হাসপাতালকে বিশেষভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই সমস্ত হাসপাতালের কার্যক্ষমতা ও চিকিৎসাসেবা নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় স্বাস্থ্য ভবনের পক্ষ থেকে কঠোর প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

হাসপাতালগুলোতে CCU পরিষেবা সংক্রান্ত চলমান অভিযোগের পাহাড় কমাতে এবং চিকিৎসা ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আনতে স্বাস্থ্য ভবনের পক্ষ থেকে একটি কঠোর ও নতুন স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউ বা SOP জারি করা হয়েছে। নতুন এই নির্দেশিকায় সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, এখন থেকে কোনো অবস্থাতেই অকারণে রোগী অন্য হাসপাতালে রেফার করা যাবে না। যদি একান্তই রেফার করার পরিস্থিতি তৈরি হয়, তবে সংশ্লিষ্ট হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে প্রথমে স্বাস্থ্য ভবনকে বিষয়টি জানাতে হবে এবং অন্য কোনো হাসপাতালে নিশ্চিতভাবে সিসিইউ বেডের ব্যবস্থা করার পরেই রোগীকে স্থানান্তরিত করতে হবে। কোনো অবস্থাতেই মুমূর্ষু বা অস্থিতিশীল রোগীকে বিনা চিকিৎসায় বা না বাঁচিয়ে রেফার করা যাবে না। এছাড়া, স্পষ্ট নির্দেশিকায় বলা হয়েছে যে, কোনো অপ্রশিক্ষিত বা জুনিয়র চিকিৎসককে এই বিভাগের দায়িত্ব দেওয়া যাবে না। শুধুমাত্র অভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদেরই ICU এবং CCU-এর ইনচার্জ হিসেবে নিয়োগ করতে হবে এবং তাঁদের প্রতিদিন নিয়মিতভাবে ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট পরিদর্শন করতে বাধ্য করা হয়েছে।

পাশাপাশি নির্দেশিকায় আরও বলা হয়েছে যে, ক্রিটিক্যাল কেয়ার ইউনিটে ডিউটি দেওয়ার ক্ষেত্রে পোস্ট গ্র্যাজুয়েট ট্রেনি বা PGT চিকিৎসকদের নির্দিষ্ট কিছু ডিগ্রি এবং পর্যাপ্ত কাজের অভিজ্ঞতা থাকলেই কেবল ডিউটি দেওয়া যাবে। সাধারণত দেখা যায়, চিকিৎসাধীন রোগীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি মারাত্মক সংক্রমণ CCU-এর পরিবেশ থেকেই ছড়ায়। এই বিপজ্জনক ব্যাকটেরিয়াল ইনফেকশন বা ক্রস-ইনফেকশন রোধ করতে প্রতিটি সরকারি হাসপাতালের CCU সপ্তাহজুড়ে অন্তত দু’বার কঠোরভাবে জীবাণুমুক্ত বা স্যানিটাইজ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। স্বচ্ছতা বজায় রাখতে এবং স্বজনপোষণ বা অনিয়ম রুখতে এখন থেকে CCU-তে ভর্তি থাকা প্রতিটি রোগীর যাবতীয় শারীরিক ও চিকিৎসার তথ্য ডিজিটাল প্রেসক্রিপশনের মাধ্যমে সরাসরি স্বাস্থ্য ভবনের অফিসিয়াল পোর্টালে আপলোড করতে হবে। সিসিইউ-এর ক্ষেত্রে সনাতন পদ্ধতি বা হাতে লেখা প্রেসক্রিপশন এবং রেজিস্টার খাতা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। পাশাপাশি ওষুধের স্টক ও চিকিৎসা সরঞ্জামের লাইভ ডেটা ডিজিটালি আপডেট করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। লোকবলের অভাবজনিত কারণে যেসব সরকারি হাসপাতালে দীর্ঘদিন ধরে সিসিইউ বেডগুলো অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে রয়েছে, সেগুলোকে অবিলম্বে মানবসম্পদ পুনর্বিন্যাস করে চালু করতে হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেক হাসপাতালেই ভেন্টিলেশন গাইডলাইন সঠিকভাবে না মানার কারণে জটিলতা বাড়ছে। তাই সমস্ত ত্রুটি দূর করে এবং রোগীদের অভিযোগ শোনার জন্য প্রতিটি হাসপাতালে একটি করে ডেডিকেটেড ‘অভিযোগ সেল’ বা গ্রিভান্স সেল খোলার নির্দেশ দিয়েছে স্বাস্থ্য ভবন।